বাজেটের আগে দুর্বল বৈশ্বিক সংকেতে সেনসেক্স ও নিফটির বড় পতন

বাজেটের আগে দুর্বল বৈশ্বিক সংকেতে সেনসেক্স ও নিফটির বড় পতন

ইউনিয়ন বাজেটের ঠিক আগে ভারতীয় শেয়ারবাজারে সতর্কতা ও অস্থিরতার পরিবেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্বল বৈশ্বিক সংকেত এবং বাজেট ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে চলার কৌশল নেন, যার প্রভাব শুক্রবারের লেনদেনের শুরুতেই দেখা যায়। সকাল থেকে বাজার লাল চিহ্নে খুলে সেনসেক্স ও নিফটি উভয় সূচকেই উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা যায়।

শুক্রবার সকালে লেনদেন শুরু হতেই বিএসই সেনসেক্স ৪৮৯.২৯ পয়েন্ট কমে ৮২,০৭৭.০৮ স্তরে নেমে আসে। একই সময়ে এনএসই নিফটি ১৭০.২৫ পয়েন্ট পড়ে ২৫,২৪৮.৬৫ স্তরে পৌঁছায়। নিফটির ২৫,২৫০ স্তরের নিচে নেমে যাওয়া বাজারের জন্য একটি দুর্বল সংকেত হিসেবে ধরা হচ্ছে।

শুরুর লেনদেনে বাজারের প্রস্থও নেতিবাচক ছিল। প্রায় ৭৪৮টি শেয়ারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেলেও ১,৬১০টি শেয়ার দরপতনের সঙ্গে লেনদেন হয়েছে। প্রায় ১৮৩টি শেয়ারে তেমন কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি, যা বাজারে বিক্রির চাপ বেশি থাকার ইঙ্গিত দেয়।

ইউনিয়ন বাজেটের আগে সাধারণত বাজারে ওঠানামা দেখা যায়। তবে এবার পতনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। বিনিয়োগকারীরা ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ কৌশল গ্রহণ করে বড় অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

বাজেটকে ঘিরে সরকারের নীতি ও ঘোষণার দিকে বিনিয়োগকারীদের নজর রয়েছে। করনীতি, ক্যাপেক্স ব্যয়, অবকাঠামো, উৎপাদন এবং সামাজিক খাত সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা নিয়ে বাজারে আগাম প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদি অবস্থান নেওয়া থেকে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দূরে থাকেন। একাধিক বড় ফান্ড হাউস ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও বাজেটের আগে পোর্টফোলিও হালকা করতে দেখা গেছে, যার ফলে অস্থিরতা বেড়েছে।

দুর্বল বৈশ্বিক সংকেতও দেশীয় বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। মার্কিন বন্ড ইয়িল্ডের দৃঢ়তা, ডলার সূচকের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে প্রভাবিত করেছে। এশীয় বাজার থেকেও শক্তিশালী দিকনির্দেশনা না আসায় তার প্রভাব দেশীয় বাজারে পড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান এবং নির্দিষ্ট খাতে বিক্রি বাজারের গতিপথকে আরও দুর্বল করেছে।

খাতভিত্তিকভাবে নিফটিতে মেটাল খাতের শেয়ারগুলিতে সর্বাধিক চাপ দেখা যায়। হিন্দালকো, টাটা স্টিল এবং জেএসডব্লিউ স্টিলের মতো বড় মেটাল শেয়ারগুলি শুরুর লেনদেনে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ছিল। ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের স্থবিরতার প্রভাব এই শেয়ারগুলিতে স্পষ্ট ছিল। পাশাপাশি জিও ফিনান্সিয়াল এবং ইটারনালের মতো কিছু হেভিওয়েট শেয়ারেও বিক্রি দেখা গেছে, যা সূচকের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

দরপতনের মধ্যেও কিছু ডিফেন্সিভ ও এফএমসিজি শেয়ারে সীমিত কেনাকাটা লক্ষ্য করা গেছে। নেসলে ইন্ডিয়া, পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন, এশিয়ান পেইন্টস, সান ফার্মা এবং গ্রাসিমের শেয়ারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। অনিশ্চয়তার সময় এই ধরনের শেয়ার তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সেখানে কেন্দ্রীভূত ছিল, যদিও সামগ্রিক বাজারের পতন পুরোপুরি সামাল দিতে তা যথেষ্ট হয়নি।

বাজারের নজর কেবল বাজেটের দিকেই নয়, কর্পোরেট আয়ের দিকেও ছিল। একাধিক বড় ও প্রভাবশালী সংস্থা তাদের ত্রৈমাসিক ফল প্রকাশ করার কথা রয়েছে, যা লেনদেনের দিকনির্দেশ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। বাজাজ অটো, এনটিপিসি, পাওয়ার গ্রিড, নেসলে ইন্ডিয়া, ব্যাংক অফ বরোদা এবং আদানি গোষ্ঠীর কয়েকটি সংস্থার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি পেটিএম, সুইগি, আইটিসি, হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স এবং টাটা মোটরসের শেয়ারেও নজর ছিল।

আইটিসি তৃতীয় ত্রৈমাসিকে প্রায় স্থিতিশীল মুনাফা জানিয়েছে এবং প্রতি শেয়ার ৬.৫০ টাকা অন্তর্বর্তী লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এই তথ্য আইটিসি শেয়ারের ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে টাটা মোটরসের কমার্শিয়াল ভেহিকল বিভাগে প্রায় ৪৮ শতাংশ মুনাফা কমার খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পে-টেক সংস্থা পেটিএম সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকে ক্ষতি থেকে মুনাফায় ফিরে এসেছে। এই ফলাফল বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে। অপরদিকে ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম সুইগির ক্ষতি বেড়েছে, যা সংশ্লিষ্ট শেয়ারের ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক দিক হিসেবে ধরা হচ্ছে।

Leave a comment