জন্ডিস হলে আমিষ একেবারে বন্ধ? অড়হর ডালেই কি মিলবে দ্রুত আরোগ্য? বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানালেন আসল সত্য

জন্ডিস হলে কি আমিষ খাবার বন্ধ করতে হবে? অড়হর ডাল বা পাতার রস খেলে কি দ্রুত সেরে যায়? জন্ডিসের ডায়েট ও চিকিৎসা নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানুন।

জন্ডিস ধরা পড়লেই অনেকের মনে প্রথম প্রশ্ন আসে—কী খাবেন, আর কী খাবেন না? প্রচলিত ধারণায় এই সময় আমিষ খাবার পুরোপুরি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। আবার অড়হর ডাল কিংবা তার পাতার রসকে অনেকে জন্ডিস সারানোর ঘরোয়া টোটকা হিসেবে মনে করেন। কিন্তু এই ধারণাগুলির কতটা সত্যি? বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বক্তব্যে এবার পরিষ্কার হল, জন্ডিসের ক্ষেত্রে খাবার নিয়ে আসলে কী কী বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন।

জন্ডিস কি নিজেই একটি রোগ?

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ও হেপাটোলজিস্ট চিকিৎসক প্রতীক পোদ্দারের মতে, জন্ডিসকে সাধারণভাবে রোগ বলা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি মূলত একটি উপসর্গ। লিভারের বিভিন্ন সমস্যা, যেমন অ্যাকিউট হেপাটাইটিস, সিরোসিস কিংবা পিত্তনালীতে পাথরের মতো সমস্যার কারণে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। তাই শুধু জন্ডিসের উপসর্গ দেখেই খাবারের তালিকা ঠিক না করে প্রথমে এর নেপথ্যে থাকা কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।

জন্ডিস হলে কি আমিষ খাওয়া একেবারে নিষেধ?

শুধু জন্ডিস হয়েছে বলেই আমিষ খাবার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে—এমন কোনও সর্বজনীন নিয়ম নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। রোগীর শরীরে ঠিক কী সমস্যা হয়েছে, তার উপর নির্ভর করবে খাদ্যতালিকা।তবে লিভার সিরোসিসের সঙ্গে যদি হেপাটিক এনসেফ্যালোপ্যাথির মতো জটিলতা থাকে, সেক্ষেত্রে প্রোটিন বা আমিষ খাবার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ, জন্ডিসেরকারণ ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতেই চিকিৎসক খাবারের বিষয়ে পরামর্শ দেবেন।

অড়হর ডাল খেলেই কি জন্ডিস সেরে যায়?

জন্ডিসে অড়হর ডাল বা অড়হর গাছের পাতার রস খেলে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা যায়—এমন প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির চিকিৎসায় তিনি এই ধরনের ঘরোয়া টোটকা প্রেসক্রাইব করেন না। এগুলির কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই।অনেকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতির উপর নির্ভর করে এই ধরনের উপায় অনুসরণ করেন। কোনও ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পর সেই পদ্ধতির উপর তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হতে পারে—যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্লেসিবো এফেক্টের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে জন্ডিসের মূল কারণের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এই ধরনের টোটকার উপর নির্ভর করা উচিত নয়।

জন্ডিসের সাধারণ লক্ষণ কী কী?

শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিসের বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন—

চোখ ও শরীরের বিভিন্ন অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া

খিদে বা রুচি কমে যাওয়া

অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা

বমি বমি ভাব

অকারণে ওজন কমে যাওয়া

ত্বকে চুলকানি হওয়া

এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে ঘরোয়া চিকিৎসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

জন্ডিস হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী?

বিশেষজ্ঞের মতে, জন্ডিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এর আসল কারণ খুঁজে বের করা। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা দরকার, জন্ডিসের নেপথ্যে হেপাটাইটিস, লিভারের অন্য কোনও সমস্যা নাকি পিত্তনালীর জটিলতা রয়েছে।পাশাপাশি নিরাপদ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। জন্ডিসের ধরন ও কারণ অনুযায়ী চিকিৎসাও আলাদা হতে পারে। তাই সবার জন্য একই ধরনের ডায়েট বা ঘরোয়া টোটকা কার্যকর হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

জন্ডিস হলেই আমিষ খাবার পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে—এমন ধারণার পিছনে সবসময় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। একইভাবে অড়হর ডাল বা পাতার রস খেলেই জন্ডিস দ্রুত সেরে যায়, এমন প্রমাণও নেই। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, জন্ডিস আসলে নিজে কোনও নির্দিষ্ট রোগ নয়; এটি শরীরে অন্য কোনও সমস্যার উপসর্গ হতে পারে। তাই আগে কারণ চিহ্নিত করে চিকিৎসা শুরু করাই সবচেয়ে জরুরি।

Leave a comment