প্রিয় খাবার সামনে থাকলেও মুখে তুললে যদি মনে হয় সবকিছুই বিস্বাদ, তাহলে বিষয়টি শুধু জিভের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। সম্পূর্ণ স্বাদ হারিয়ে যাওয়াকে ‘এজিউসিয়া’ বলা হয়। এর নেপথ্যে যেমন সংক্রমণ বা কিছু ওষুধ থাকতে পারে, তেমনই শরীরে নির্দিষ্ট পুষ্টির ঘাটতিও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই দীর্ঘদিন স্বাদ না পেলে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
‘এজিউসিয়া’ আসলে কী?
খাবারের স্বাদ সম্পূর্ণভাবে অনুভব করতে না পারাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এজিউসিয়া বলা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে মিষ্টি, নোনতা, টক বা তেতো—কোনও স্বাদই ঠিকমতো বোঝা যায় না। আবার স্বাদ পুরোপুরি হারিয়ে না গিয়ে অস্বাভাবিক বা বদলে যাওয়া স্বাদ অনুভূত হতে পারে, যাকে বলা হয় ‘ডিসজিউসিয়া’।এই সমস্যার কারণে খাওয়ার ইচ্ছা কমে যেতে পারে এবং দীর্ঘদিন চললে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসতে পারে।
কোন ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতিতে সমস্যা হতে পারে?
স্বাদহীনতার সম্ভাব্য পুষ্টিগত কারণগুলির মধ্যে ভিটামিন B12, ভিটামিন B3 (নিয়াসিন) এবং জিঙ্কের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য। তবে শুধু কোনও একটি ভিটামিনের অভাব হলেই যে প্রত্যেকের স্বাদ সম্পূর্ণ চলে যাবে, এমন নয়।
ভিটামিন B12
স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য B12 গুরুত্বপূর্ণ। এর ঘাটতি হলে জিহ্বায় প্রদাহ বা মুখের বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যা স্বাদ অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ভিটামিন B3 বা নিয়াসিন
নিয়াসিন শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি হলে মুখ ও জিহ্বার স্বাভাবিক অবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে এবং তার সঙ্গে স্বাদের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
জিঙ্ক
জিঙ্ক ভিটামিন নয়, এটি একটি প্রয়োজনীয় খনিজ। স্বাদগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত টেস্ট বাডের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও রক্ষণাবেক্ষণে জিঙ্কের ভূমিকা রয়েছে। তাই শরীরে জিঙ্কের ঘাটতি থাকলেও স্বাদ কমে যাওয়া বা বদলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শুধু ভিটামিনের অভাবেই স্বাদ চলে যায় না
স্বাদ হারানোর পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন—
ভাইরাস বা অন্যান্য সংক্রমণ
মুখ ও সাইনাসের সংক্রমণ
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
স্নায়বিক সমস্যা বা স্নায়ুর ক্ষতি
ডায়াবেটিস
হাইপোথাইরয়েডিজম
মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় রেডিয়েশন থেরাপি
মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা মুখের স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা
তাই শুধু ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খেলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কীভাবে কারণ জানা যায়?
স্বাদহীনতা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসক সাধারণত রোগীর উপসর্গ ও চিকিৎসার ইতিহাস পর্যালোচনা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী মুখ ও জিহ্বা পরীক্ষা, স্বাদ অনুভূতির মূল্যায়ন এবং রক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে।রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে B12, অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি কিংবা ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের মতো কিছু অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিতও পাওয়া যেতে পারে।
চিকিৎসা কী?
চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে সমস্যার কারণের উপর নির্ভর করে। যদি পুষ্টির ঘাটতি ধরা পড়ে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন বা প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হতে পারে। আবার কোনও ওষুধের কারণে সমস্যা হলে চিকিৎসক ওষুধ পরিবর্তন বা অন্য ব্যবস্থা নিতে পারেন।নিজে থেকে বেশি মাত্রায় ভিটামিন বা জিঙ্কের সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে আগে কারণ নির্ণয় করাই নিরাপদ।
স্বাদ কমে গেলে কী করবেন?
স্বাদহীনতার সময়ও সুষম খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা জরুরি। পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। খাবারকে আকর্ষণীয় করতে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর মশলা, গন্ধ ও খাবারের টেক্সচার ব্যবহার করা যেতে পারে।তবে হঠাৎ করে সম্পূর্ণ স্বাদ চলে গেলে, দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে বা এর সঙ্গে অন্য কোনও উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মুখে খাবার দিলেই স্বাদহীন লাগছে? একেবারেই মিষ্টি, নোনতা, টক বা তেতো বুঝতে পারছেন না? চিকিৎসাবিজ্ঞানে সম্পূর্ণ স্বাদ হারানোর এই অবস্থাকে বলা হয় ‘এজিউসিয়া’। সংক্রমণ, কিছু ওষুধ, স্নায়বিক সমস্যা এবং পুষ্টির ঘাটতি—বিভিন্ন কারণেই এমনটা হতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন B12, ভিটামিন B3 এবং জিঙ্কের ঘাটতি স্বাদ অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।













