একই গাছে যদি ল্যাংড়া, চৌসা, আলফানসো, দশেহরি এবং আরও শতাধিক জাতের আম ঝুলতে দেখা যায়, তাহলে সেটিকে রূপকথা বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এমনই এক বিস্ময়কর আমগাছ রয়েছে উত্তরপ্রদেশের Malihabad-এ। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণা, ধৈর্য এবং উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে এই অনন্য কৃতিত্ব গড়েছেন ‘ম্যাঙ্গো ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ হাজি কলিম উল্লাহ খান।
আমের শহরে জন্ম এক অনন্য স্বপ্নের
উত্তরপ্রদেশের মালিহাবাদ বহুদিন ধরেই আম চাষের জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলের বাসিন্দা হাজি কলিম উল্লাহ খান ছোটবেলা থেকেই আমের বাগানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পারিবারিক বাগানের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করেননি, বরং নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আম চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা শুরু করেন।
গ্রাফটিং প্রযুক্তিতেই লুকিয়ে সাফল্যের রহস্য
একই গাছে শত শত জাতের আম ফলানোর নেপথ্যে রয়েছে ‘গ্রাফটিং’ বা কলম করার বিশেষ পদ্ধতি। এই প্রযুক্তিতে বিভিন্ন জাতের আমগাছের ডাল একটি শক্তিশালী মূল গাছের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। ১৯৫৭ সাল থেকে এই পদ্ধতি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা শুরু করেন হাজি কলিম উল্লাহ খান। বছরের পর বছর অধ্যবসায়ের ফলস্বরূপ তিনি এমন একটি গাছ তৈরি করতে সক্ষম হন, যেখানে বর্তমানে ৩০০ থেকে ৩৫০টিরও বেশি জাতের আম ফলছে।
প্রতিটি আমের স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য আলাদা
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, একই গাছে ফললেও প্রতিটি আম তার নিজস্ব স্বাদ, গন্ধ, রং এবং বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে। এই গাছে যেমন জনপ্রিয় আলফানসো, ল্যাংড়া, চৌসা, কেসর ও দশেহরি জাতের আম রয়েছে, তেমনই রয়েছে তাঁর উদ্ভাবিত একাধিক নতুন হাইব্রিড জাত। ফলে এটি শুধুমাত্র একটি গাছ নয়, যেন গোটা আম গবেষণাগারের জীবন্ত উদাহরণ।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে নতুন আমের জাত
নিজের উদ্ভাবিত কয়েকটি নতুন আমের নামও রেখেছেন তিনি দেশের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নামে। সেই তালিকায় রয়েছেন Sachin Tendulkar, Amitabh Bachchan, Narendra Modi এবং Aishwarya Rai Bachchan। তাঁর এই অভিনব উদ্যোগ কৃষি ও উদ্যানতত্ত্বের জগতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পদ্মশ্রী থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
আম চাষে অসাধারণ অবদানের জন্য ২০০৮ সালে হাজি কলিম উল্লাহ খানকে ভারতের অন্যতম সম্মানজনক নাগরিক পুরস্কার Padma Shri প্রদান করা হয়। পাশাপাশি তাঁর নাম স্থান পেয়েছে লিমকা বুক অব রেকর্ডসেও। বর্তমানে তাঁর বাগান দেশ-বিদেশের কৃষক, গবেষক এবং উদ্যানতত্ত্ববিদদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
বিদেশ থেকেও ছুটে আসেন গবেষকরা
ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত-সহ বিভিন্ন দেশের কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষকরা তাঁর গ্রাফটিং প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার জন্য মালিহাবাদে আসেন। তাঁদের মতে, এই প্রযুক্তি শুধু কৃষিতে বৈচিত্র্যই বাড়ায় না, বরং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার ও উৎপাদন বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করে।
একটি মাত্র আমগাছে একসঙ্গে ল্যাংড়া, আলফানসো, চৌসা, কেসর-সহ ৩০০-রও বেশি জাতের আম! উত্তরপ্রদেশের মালিহাবাদের কৃষক Haji Kalim Ullah Khan তাঁর অভিনব গ্রাফটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ‘ম্যাঙ্গো ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ নামে পরিচিত এই কৃষকের সাফল্য আজ বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়।













