কলকাতার মোমিনপুর এলাকায় প্রায় ছয় দশক ধরে চলে আসা জন্মাষ্টমীর একটি ঐতিহ্যে এ বছর পরিবর্তন এসেছে। ভুকৈলাশ রোড ও হুসেইন শাহ রোডের সংযোগস্থলের কাছে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের এবারের ৫৮তম আয়োজন পরিচালনা করবেন শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা। আয়োজক কমিটি থেকে মুসলিম সদস্যদের বাদ দেওয়ার তথ্য সামনে আসার পর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং অনুষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত সদস্যদের মতে, প্রায় ছয় দশক আগে মোহাম্মদ কাশিম নামে এক মুসলিম সমাজকর্মী এই জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে আয়োজনটি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেও ২০১১ সালের পর মুসলিম যুবকদের একটি দল এটিকে ফের সক্রিয় করে। এরপর বহু বছর ধরে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে জন্মাষ্টমী পালন করে আসেন। প্রায় ২০ সদস্যের আয়োজক কমিটিতে প্রায় অর্ধেক সদস্য মুসলিম সম্প্রদায়ের ছিলেন। পুজোর আচার থেকে প্রসাদ বিতরণ এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় দুই সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নিতেন।
পুরনো আয়োজকদের দাবি, গত কয়েক বছরে জন্মাষ্টমীর এই অনুষ্ঠানটি স্থানীয় স্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা আয়োজনের বিভিন্ন কাজে অংশ নিতেন এবং হিন্দু ভক্তদের সঙ্গে মিলিতভাবে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনায় সহযোগিতা করতেন। অনুষ্ঠানে প্রসাদ বিতরণ করা হতো এবং জন্মাষ্টমী-সংক্রান্ত ধর্মীয় আচার নির্ধারিত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হতো।
এ বছর অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন এসেছে। আয়োজক কমিটির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, এবার কমিটিতে মুসলিম সদস্যদের রাখা হয়নি এবং জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা। অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বিজেপির প্রাক্তন প্রার্থী রাকেশ সিংও বলেছেন, এ বছর অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র হিন্দুদের দ্বারা আয়োজিত হবে। তাঁর বক্তব্য, জন্মাষ্টমী হিন্দু ধর্মের উৎসব এবং এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরই থাকা উচিত।
রাকেশ সিংয়ের মতে, অন্য ধর্মের মানুষ জন্মাষ্টমীর প্যান্ডেলে আসতে পারেন, তবে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব হিন্দু সম্প্রদায়ের হওয়া উচিত। তিনি বিষয়টিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অন্যদিকে, পুরনো অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত মুসলিম সদস্যদের বক্তব্য, তাঁরা বহু বছর ধরে এই আয়োজনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন এবং কমিটিতে হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের সদস্যই থাকতেন। এবার মুসলিম সদস্যদের কমিটি থেকে বাদ দেওয়াকে তাঁরা পুরনো ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।
অনুষ্ঠানের পুরনো সদস্য মোহাম্মদ আলম জানান, ২০১১ সাল থেকে মুসলিম যুবকরাও আয়োজনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ সদস্যের কমিটিতে অর্ধেক সদস্য মুসলিম ছিলেন। সবাই মিলে অনুষ্ঠান পরিচালনা, প্রসাদ বিতরণ এবং জন্মাষ্টমীর ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করতেন। এবার কমিটি থেকে মুসলিম সদস্যদের বাদ দেওয়াকে তিনি আয়োজনের পুরনো কাঠামোয় বড় পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ বছরের অনুষ্ঠানস্থলে প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে গেরুয়া ও সাদা রঙের একটি বড় প্যান্ডেল তৈরি করা হচ্ছে। প্যান্ডেল নির্মাণ এবং অনুষ্ঠানের অন্যান্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি চলছে। অনুষ্ঠানস্থল সাজানো হচ্ছে এবং জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ভক্তদের উপস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মোমিনপুরের এই অনুষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হওয়ার অন্যতম কারণ, এটি কলকাতার এমন একটি সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিল যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। ছয় দশকের দীর্ঘ ইতিহাসে জন্মাষ্টমীর এই অনুষ্ঠানের কাঠামো একাধিকবার পরিবর্তিত হলেও হিন্দু-মুসলিম যৌথ অংশগ্রহণ এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। এবার কমিটির কাঠামো বদলানোর পর সেই পুরনো ব্যবস্থার অবসান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই অনুষ্ঠানের ইতিহাস শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি এলাকার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণেরও অংশ ছিল। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ অনুষ্ঠানটির সূচনায় ভূমিকা নেন এবং পরবর্তী সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে মিলিতভাবে তা এগিয়ে নিয়ে যান। এর ফলে স্থানীয় স্তরে অনুষ্ঠানটির একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়।
এবার অনুষ্ঠানটির পরিচালনা শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় পুরনো আয়োজক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ভিন্ন মতও দেখা দিয়েছে। আয়োজকদের একাংশের বক্তব্য, যে সম্প্রদায়ের উৎসব, সেই সম্প্রদায়ের মানুষেরই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনার অধিকার থাকা উচিত। অন্যদিকে, পুরনো আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এটিকে বহু বছর ধরে চলে আসা যৌথ অংশগ্রহণের অবসান হিসেবে দেখছেন।
এই পরিবর্তন এমন সময়ে হয়েছে যখন পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকে দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে আয়োজনে হিন্দু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার খবরও সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে মোমিনপুরের জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানের পরিবর্তন রাজনৈতিক ও সামাজিক—দুই ক্ষেত্রেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যে অনুষ্ঠানের সূচনা মুসলিম সমাজকর্মী মোহাম্মদ কাশিমের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়, সেই অনুষ্ঠানেই বর্তমানে আয়োজক কমিটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ থাকছে না। প্রায় ছয় দশকের ব্যবধানে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কাঠামোতে এই ধরনের পরিবর্তন স্থানীয় ইতিহাস ও সামাজিক সম্পর্কের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জন্মাষ্টমীর সময় প্রতি বছর মোমিনপুরের অনুষ্ঠানস্থলে বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত হন। এবারও প্রস্তুতি চলছে এবং প্যান্ডেল নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং কমিটির কাঠামো আগের বছরগুলোর তুলনায় আলাদা হবে। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের প্রবেশ নিয়েও আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্য ধর্মের মানুষ প্যান্ডেলে আসতে পারবেন, তবে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবেন হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা।
২০২৬ সালের জন্মাষ্টমী দেশজুড়ে ৪ সেপ্টেম্বর পালিত হবে। কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গেও মন্দির ও পুজোর প্যান্ডেলে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এই সময়ে মোমিনপুরের পুরনো জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানের কাঠামোয় পরিবর্তন বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
মোমিনপুরের প্রায় ছয় দশক পুরনো জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানের এবারের আয়োজন আগের কাঠামো থেকে আলাদা। মুসলিম সমাজকর্মী মোহাম্মদ কাশিমের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা এই ঐতিহ্যে দীর্ঘদিন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ যৌথভাবে অংশ নিয়েছেন। ২০১১ সালের পর মুসলিম যুবকরাও অনুষ্ঠানটি পুনরায় সক্রিয় করতে ভূমিকা নেন এবং আয়োজক কমিটিতে মুসলিম সদস্যদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য শুধুমাত্র হিন্দু সদস্যদের নিয়ে কমিটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে।











