লম্বা সফরের কথা ভাবলেই কারও কারও চিন্তা শুরু হয়ে যায়—গাড়িতে উঠলেই গা গুলিয়ে বমি! বাস, ট্রেন এমনকী বিমানে যাত্রার সময়ও দেখা দিতে পারে মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, অস্বস্তির মতো সমস্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে মোশন সিকনেস বা গতিজনিত অসুস্থতা বলা হয়। তবে কয়েকটি সহজ অভ্যাস মেনে চললে যাত্রাপথের অস্বস্তি অনেকটাই কমানো যেতে পারে।
কেন হয় মোশন সিকনেস?
মোশন সিকনেসের মূল কারণ শরীরের নড়াচড়া সম্পর্কে চোখ, অন্তঃকর্ণ এবং মস্তিষ্কে পৌঁছনো সংকেতের মধ্যে অসামঞ্জস্য।ধরুন, আপনি চলন্ত গাড়ির ভিতরে বসে আছেন। চোখের সামনে হয়তো গাড়ির ভিতরের স্থির অংশই দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে অন্তঃকর্ণ শরীরের গতি ও ভারসাম্যের পরিবর্তন বুঝতে পারছে। ফলে মস্তিষ্ক একই সময়ে ভিন্ন ধরনের সংকেত পায়। এই বিভ্রান্তির ফলেই মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা বমির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
সম্ভব হলে সামনের আসন বেছে নিন
গাড়ি বা বাসে যাঁদের মোশন সিকনেস হয়, তাঁরা সম্ভব হলে সামনের দিকে বসতে পারেন। বাইরে রাস্তা ও দূরের দৃশ্য দেখার সুযোগ থাকলে শরীরের গতির সঙ্গে চোখের দেখা দৃশ্যের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সুবিধা হতে পারে।তবে নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে গাড়িতে বসার ক্ষেত্রে অবশ্যই সিটবেল্ট ব্যবহার করুন এবং চালকের আসনের ঠিক পাশে বসার নিয়ম স্থানীয় নিরাপত্তাবিধি অনুযায়ী মেনে চলুন।
মোবাইল বা বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না
চলন্ত গাড়িতে বসে মোবাইল দেখা, বই পড়া বা খুব কাছের কোনও জিনিসের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে অস্বস্তি বাড়তে পারে।তার পরিবর্তে জানালার বাইরে দূরের কোনও স্থির বিন্দু বা দিগন্তের দিকে তাকানোর চেষ্টা করুন। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়াও অনেকের ক্ষেত্রে স্বস্তি দিতে পারে।
যাত্রার আগে অতিরিক্ত খাবার খাবেন না
ভ্রমণের ঠিক আগে পেট ভরে ভারী খাবার খেলে বমি বমি ভাব বাড়তে পারে। তাই যাত্রার আগে এবং সফরের সময় খুব বেশি খাবার না খেয়ে অল্প পরিমাণে হালকা খাবার খাওয়া যেতে পারে।পাশাপাশি শরীরে পানির ঘাটতি যাতে না হয়, সেদিকেও নজর রাখুন। অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা ভালো।
আদার ক্যান্ডি বা লজেন্স সঙ্গে রাখতে পারেন
যাত্রাপথে গা গুলিয়ে উঠলে অনেকে আদার ক্যান্ডি বা লজেন্স চুষে স্বস্তি পান। তাই যাঁদের নিয়মিত মোশন সিকনেসের সমস্যা হয়, তাঁরা ভ্রমণের সময় সঙ্গে রাখতে পারেন।তবে এটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অস্বস্তি বেশি হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
গান শুনে মন অন্যদিকে রাখুন
যাত্রাপথে মোশন সিকনেসের অস্বস্তি শুরু হলে মন অন্যদিকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতে পারেন। পছন্দের গান বা অডিও শোনা তার একটি সহজ উপায় হতে পারে।তবে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে শুধুমাত্র অডিও শোনাই ভালো, বিশেষ করে যদি স্ক্রিন দেখলে আপনার অস্বস্তি বেড়ে যায়।
ধূমপান এড়িয়ে চলুন, ওষুধে সতর্ক থাকুন
যাঁদের মোশন সিকনেসের প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ভ্রমণের সময় ধূমপান এড়িয়ে চলা উচিত। ধোঁয়া ও গন্ধও অনেকের ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব বাড়িয়ে দিতে পারে।ঘরোয়া উপায়ে সমস্যা সামলানো না গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে মোশন সিকনেসের ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এই ধরনের কিছু ওষুধে ঘুমঘুম ভাব বা তন্দ্রা দেখা দিতে পারে। তাই নিজের ইচ্ছায় ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ওষুধ দেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শিশুদের ক্ষেত্রে কেন বাড়তি সতর্কতা জরুরি?
মোশন সিকনেস যে কোনও বয়সে হতে পারে, তবে শিশুদের মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। তাই ছোটদের নিয়ে দীর্ঘ সফরে বের হলে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া ভালো।শিশুকে নিজের মতো করে মোশন সিকনেসের ওষুধ না দিয়ে বয়স ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
গাড়ি, বাস, ট্রেন বা বিমানে উঠলেই অনেকের মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা বমির সমস্যা হয়। চোখ ও অন্তঃকর্ণ থেকে মস্তিষ্কে আসা সংকেতের অসামঞ্জস্যের কারণে এমনটা হতে পারে। তবে সঠিক আসন বেছে নেওয়া, দূরের দিকে তাকানো, হালকা খাবার খাওয়া এবং কিছু সহজ সতর্কতা মেনে চললে মোশন সিকনেসের সমস্যা অনেকটাই সামলানো সম্ভব।













