জিভে বা গালের ভিতরে ছোট্ট ঘা হয়েছে—সাধারণত কয়েকদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু সেই ঘা যদি দিনের পর দিন একই জায়গায় থেকে যায়, তখন বিষয়টি একটু গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘস্থায়ী ঘা সবসময় ক্যানসার না হলেও মুখের কিছু প্রি-ক্যানসারাস পরিবর্তন বা ওরাল ক্যানসারের সতর্ক সংকেত হতে পারে। তাই কোন লক্ষণগুলিতে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ মুখের ঘা সাধারণত কতদিন থাকে?
মুখ বা জিহ্বার সাধারণ আলসার অনেক সময় কয়েক দিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে ভালো হয়ে যায়। তাই কোনও ঘা হওয়ার পর সেটি নিজে থেকেই সেরে যাচ্ছে কি না, তা লক্ষ্য করা দরকার।তবে ২ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঘা থেকে গেলে, একই জায়গায় বারবার হলে অথবা ক্রমশ সেটির আকার বাড়তে থাকলে বিষয়টি পরীক্ষা করানো উচিত। শুধু দেখে নিজে থেকে সেটিকে সাধারণ আলসার বা ক্যানসার—কোনওটাই ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তামাক ও গুটখা সেবনকারীদের বাড়তি সতর্কতা
সিগারেট, খৈনি, গুটখা, সুপারি-সহ বিভিন্ন ধরনের তামাকজাত দ্রব্য দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে মুখের ভিতরের টিস্যুতে ক্ষতিকর পরিবর্তন হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অ্যালকোহল সেবনের সঙ্গেও মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি সম্পর্কিত বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে জানা যায়।তাই এই ধরনের অভ্যাস থাকলে মুখের ঘা, দাগ, ফোলা বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন দীর্ঘদিন থাকলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গুটখা ও সুপারি থেকে হতে পারে Oral Submucous Fibrosis
দীর্ঘদিন গুটখা বা সুপারি খাওয়ার ফলে মুখের ভিতরের টিস্যু শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। একে Oral Submucous Fibrosis বলা হয়।এই সমস্যায় ধীরে ধীরে মুখ খোলার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। শুরুতে পান বা গুটখা খেতে অস্বস্তি হতে পারে, পরে মুখ খুলে খাবার খাওয়া বা কথা বলার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
মুখের সাদা বা লাল দাগও নজরে রাখুন
গালের ভিতর, জিহ্বা কিংবা মাড়িতে অস্বাভাবিক সাদা বা লাল ছোপ দেখা গেলে সেটিও চিকিৎসকের নজরে আনা প্রয়োজন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধরনের সাদা ও লাল পরিবর্তনকে যথাক্রমে Leukoplakia এবং Erythroplakia বলা হয়।তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সাদা বা লাল দাগই ক্যানসার নয়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক দাগের কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
কোন কোন লক্ষণকে অবহেলা করবেন না?
মুখের ঘার পাশাপাশি নিচের কোনও লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
২ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঘা না শুকানো
একই জায়গায় বারবার ঘা হওয়া
ঘা বা ক্ষত ধীরে ধীরে বড় হওয়া
মুখের ভিতরে অস্বাভাবিক সাদা বা লাল দাগ
মুখে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
অকারণে মুখ থেকে রক্তপাত
জিহ্বা বা মাড়িতে দীর্ঘদিন ব্যথা
মুখের কোনও অংশে অসাড়তা বা অনুভূতি কমে যাওয়া
গিলতে অসুবিধা
কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন
ঘাড়ে অস্বাভাবিক চাকা বা পিণ্ড
বিশেষ করে তামাক বা অ্যালকোহল ব্যবহারের ইতিহাস থাকলে এই লক্ষণগুলির ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বাড়িতে কীভাবে মুখের পরিবর্তন নজরে রাখবেন?
মাঝে মাঝে ভালো আলোয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখের ভিতরটা দেখে নিতে পারেন। গালের ভিতরের অংশ, জিহ্বার উপর ও নীচের দিক, মাড়ি এবং তালুতে কোনও অস্বাভাবিক দাগ, ঘা, ফোলা বা রঙের পরিবর্তন হয়েছে কি না খেয়াল করুন।তবে এটি চিকিৎসকের পরীক্ষার বিকল্প নয়। কোনও পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হলে ডেন্টিস্ট, ওরাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
প্রয়োজনে কী পরীক্ষা হতে পারে?
দীর্ঘস্থায়ী ঘা বা সন্দেহজনক কোনও পরিবর্তন থাকলে চিকিৎসক প্রথমে মুখের ভিতর পরীক্ষা করবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও পরীক্ষা দিতে পারেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী বায়োপসি বা অন্যান্য পরীক্ষা করার পরামর্শও দেওয়া হতে পারে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শুধু ঘা হয়েছে বলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার দীর্ঘদিনের ঘাকে সাধারণ সমস্যা ভেবে ফেলে রাখাও ঠিক নয়।
মুখের ঘা খুবই সাধারণ সমস্যা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। কিন্তু কোনও ঘা যদি ২ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে থেকে যায়, বারবার একই জায়গায় হয়, আকারে বড় হতে থাকে কিংবা তার সঙ্গে অন্য কোনও পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে তামাক, গুটখা, খৈনি, সুপারি বা অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস থাকলে মুখের দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনকে অবহেলা করা ঠিক নয়।













