মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং চার দিনের সরকারি সফরে ভারতে পৌঁছেছেন। ৩০ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত এই সফর চলাকালে তিনি বোধগয়া, নয়াদিল্লি এবং মুম্বই সফর করবেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করসহ একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক করবেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, ভারত প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানাতে আগ্রহী। মন্ত্রণালয়ের মতে, তাঁর প্রস্তাবিত ভারত সফরের সময় দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন গতি দেওয়া, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং সীমান্ত নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। সফরটি এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ভারত ও মিয়ানমার উভয়ই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং সংযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভারত ও মিয়ানমার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভাগ করে। মিয়ানমার ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ এবং ‘মহাসাগর’ (MAHASAGAR) নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্র বাণিজ্য, জ্বালানি, নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় পর্যন্ত বিস্তৃত।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, প্রেসিডেন্ট হ্লাইং ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে। দুই নেতা পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও ফলাফলমুখী করার উপায় নিয়েও আলোচনা করবেন।
![]()
প্রেসিডেন্ট হ্লাইংয়ের কর্মসূচিতে বোধগয়ার মহাবোধি মন্দির এবং সুজাতা মন্দির পরিদর্শন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বোধগয়া বিশ্ব বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান, যেখানে গৌতম বুদ্ধ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি বৌদ্ধ ঐতিহ্যের মাধ্যমে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককেও শক্তিশালী করতে পারে।
ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করে, যা উভয় দেশ তাদের কূটনৈতিক অংশীদারিত্বে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করছে।
সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করাও। প্রেসিডেন্ট হ্লাইংয়ের সঙ্গে আসা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলে একাধিক মন্ত্রিসভার সদস্য, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এবং শিল্পক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। ৩১ মে অনুষ্ঠিতব্য ভারত-মিয়ানমার বাণিজ্য ফোরামে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কৃষি, জ্বালানি, লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।
ভারত মিয়ানমারকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবেশের একটি কৌশলগত দ্বার হিসেবে দেখে, অন্যদিকে মিয়ানমার ভারতীয় বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতাকে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
ভারত ও মিয়ানমার প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ যৌথ সীমান্ত ভাগ করে। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অবৈধ কার্যকলাপ প্রতিরোধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয় দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ভারতের সমর্থিত একাধিক সংযোগ প্রকল্প, যার মধ্যে সড়ক, বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামো সম্পর্কিত পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলিও আলোচনার অংশ হতে পারে। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সংযোগ উন্নত করা।
নয়াদিল্লিতে প্রেসিডেন্ট হ্লাইংয়ের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর পৃথক বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হায়দরাবাদ হাউসে বৈঠকটি সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট হ্লাইং “দ্য লাইট অ্যান্ড দ্য লোটাস: রেলিকস অব দ্য অ্যাওয়েকেন্ড ওয়ান” প্রদর্শনীও পরিদর্শন করবেন, যেখানে ভারতের সমৃদ্ধ বৌদ্ধ ঐতিহ্য প্রদর্শিত হচ্ছে।
সফরের শেষ পর্যায়ে তিনি মুম্বই সফর করবেন, যেখানে শিল্পক্ষেত্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক বৈঠকে অংশ নেবেন। মহারাষ্ট্রের রাজ্যপালের সঙ্গে তাঁর বৈঠকেরও প্রস্তাব রয়েছে।











