বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন কালীমন্দির ও শক্তিপীঠ। কোথাও শতাব্দীপ্রাচীন পারিবারিক পুজো, কোথাও আবার বিশেষ তন্ত্রসাধনার রীতি। কিন্তু নদিয়ার এমন একটি গ্রাম রয়েছে, যেখানে একটি-দুটি নয়, একসঙ্গে ৩০০-রও বেশি কালীপুজোর আয়োজন হয়! কৃষ্ণনগর-২ নম্বর ব্লকের বেলপুকুর গ্রাম। প্রায় চার শতাব্দী ধরে চলে আসা তন্ত্রসাধনার পরম্পরার জন্য স্থানীয়দের কাছে এই জনপদ পরিচিত 'তন্ত্রগ্রাম' নামে। কার্তিকী অমাবস্যায় গোটা গ্রাম পরিণত হয় দেবী আরাধনার এক বিশাল উৎসব প্রাঙ্গণে।
৪০০ বছরের পুরনো তন্ত্রসাধনার ইতিহাস
বেলপুকুরের কালীপুজোর ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, রাজা রুদ্র রায়ের আমলে এই এলাকায় তন্ত্রসাধনার সূচনা হয়েছিল।কথিত আছে, একদিন শিকারে বেরিয়ে রাজা রুদ্র রায় একটি বেলগাছের নীচে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় সাধক রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখতে পান। সাধকের আধ্যাত্মিক জ্ঞান, সাধনা ও পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে রাজা তাঁকে নিজের গুরু হিসেবে গ্রহণ করেন।এরপর ওই সাধকের হাত ধরেই এলাকায় কালীসাধনা ও তান্ত্রিক উপাসনার প্রসার ঘটে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সময়ের সঙ্গে সেই সাধনার ধারা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের বিভিন্ন পরিবারে।
একটি গ্রামেই ৩০০ থেকে ৩৫০টি কালীপুজো!
বেলপুকুরের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হল কালীপুজোর সংখ্যা। বর্তমানে গ্রামে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০টি পারিবারিক ও গোষ্ঠীগত কালীপুজোর আয়োজন করা হয়।কার্তিকী অমাবস্যা এলেই গ্রামজুড়ে শুরু হয় উৎসবের আবহ। প্রতিটি পরিবারের পুজোর নিজস্ব নিয়ম, আচার ও ঐতিহ্য রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই আরাধনা চলে আসছে।শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বেলপুকুরের মানুষের কাছে কালীপুজো তাঁদের পারিবারিক পরিচয়, বিশ্বাস এবং বহু বছরের সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
দক্ষিণাকালীর পর বিশেষভাবে পূজিত হন দেবী তারা
বেলপুকুরের কালীপুজোর অন্যতম আকর্ষণ দেবী তারার আরাধনা। এখানে প্রচলিত কালীপুজোর পাশাপাশি দেবী তারার বিশেষ উগ্ররূপের উপাসনার রীতিও রয়েছে।প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সাধনপরম্পরার সঙ্গে সাধক রামচন্দ্র ভট্টাচার্যের যোগ রয়েছে।কার্তিকী অমাবস্যায় প্রথমে দক্ষিণাকালীর পুজো সম্পন্ন করা হয়। এরপর প্রতিমা বিসর্জনের পর তান্ত্রিক রীতিতে দেবী তারার বিশেষ আরাধনা অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশেষ উপাসনাপদ্ধতি বেলপুকুরের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
হ্যারিকেন ও গ্যাসলাইটের আলোয় হত পুজো
একসময় বেলপুকুরের কালীপুজোয় আধুনিক আলোকসজ্জা বা জাঁকজমকের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। হ্যারিকেন, মোমবাতি এবং গ্যাসলাইটের আলোতেই চলত দেবীর আরাধনা।সময় বদলেছে, এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। পুজোর আয়োজনেও যুক্ত হয়েছে নতুনত্ব। তবে আজও গ্রামের বহু পরিবার পুরনো তান্ত্রিক রীতিনীতি ও পারিবারিক পরম্পরা মেনে পুজো করে চলেছেন।আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের এই সহাবস্থানই বেলপুকুরের কালীপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কালীসাধনার পাশাপাশি রয়েছে বৈষ্ণব সংস্কৃতির ইতিহাস
বেলপুকুরের পরিচয় শুধু শাক্ত ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৈষ্ণব সংস্কৃতির ইতিহাসও।গ্রামের মদনগোপাল মন্দির সেই প্রাচীন বৈষ্ণব পরম্পরার অন্যতম স্মারক। ফলে একই জনপদে একদিকে যেমন কালীসাধনা ও তন্ত্রচর্চার ঐতিহ্য রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে বৈষ্ণব উপাসনার ধারাও।শাক্ত ও বৈষ্ণব সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন বেলপুকুরকে বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।
নদিয়ার কৃষ্ণনগর-২ নম্বর ব্লকের বেলপুকুর গ্রাম কালীপুজোর এক অনন্য ঠিকানা। প্রায় ৪০০ বছরের তন্ত্রসাধনার ঐতিহ্যকে ঘিরে এখানে প্রতিবছর কার্তিকী অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত হয় ৩০০ থেকে ৩৫০টি কালীপুজো। কোথাও দক্ষিণাকালীর আরাধনা, কোথাও দেবী তারার বিশেষ পুজো। রাজা রুদ্র রায় ও সাধক রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই গ্রামের প্রাচীন ইতিহাস। শাক্ত সংস্কৃতির পাশাপাশি রয়েছে বৈষ্ণব ঐতিহ্যের নিদর্শনও।









