দিল্লির ভবন ধসের পর নয়ডায় জীর্ণ ও দুর্বল ভবনের সমীক্ষা শুরু

দিল্লির সত্য নিকেতনে ভবন ধসের পর নয়ডা কর্তৃপক্ষ সদরপুর, মামুরা, নিঠারি ও সালারপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জীর্ণ ও দুর্বল ভবনের সমীক্ষা শুরু করেছে। সেক্টর-৩১-এর ১২৮টি জনতা ফ্ল্যাট খালি করানোর প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।
দিল্লির ভবন ধসের পর নয়ডায় জীর্ণ ও দুর্বল ভবনের সমীক্ষা শুরু
Photo Credit / Attribution: Google

দিল্লির সত্য নিকেতনে জীর্ণ ভবন ধসের ঘটনার পর নয়ডা কর্তৃপক্ষও শহরের দুর্বল ও জীর্ণ ভবন নিয়ে সক্রিয় হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা রুখতে কর্তৃপক্ষ একাধিক এলাকায় এমন বাড়ির সমীক্ষা শুরু করেছে, যেগুলোর অবস্থা খারাপ বলে জানা যাচ্ছে। সদরপুর, নিঠারি, মামুরা এবং সালারপুরসহ একাধিক গ্রাম ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভবনগুলোর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সমীক্ষার সময় কোনো বাড়িতে গুরুতর নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি পাওয়া গেলে নোটিস জারি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই অভিযানের মধ্যে সেক্টর-৩১-এর ১২৮টি ফ্ল্যাটের বিষয়টিও ফের সামনে এসেছে। সেক্টর-৩১-এর সি ব্লকে থাকা এই ফ্ল্যাটগুলো দীর্ঘদিন ধরে জীর্ণ অবস্থার কারণে উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। নয়ডা কর্তৃপক্ষ এই ১২৮টি ফ্ল্যাট খালি করানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং সেখানে বসবাসকারী বরাদ্দপ্রাপকদের নোটিস জারি করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, ভবনগুলোর দেওয়াল, ছাদ-বারান্দার অংশ এবং অন্যান্য কাঠামোর অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশেষ করে বর্ষার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

এই ১২৮টি ফ্ল্যাটের ইতিহাসও পুরনো। অমর উজালার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেক্টর-৩১-এ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির জন্য এই জনতা ফ্ল্যাটগুলো ১৯৮০ সালে নির্মাণ ও বরাদ্দ করা হয়েছিল। আগস্ট ২০২৫-এ বৃষ্টির সময় একটি ফ্ল্যাটের ছাদ ধসে পড়েছিল। সেই সময় সেখানে কেউ উপস্থিত না থাকায় বড় দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। ঘটনার পর প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ সি ব্লকের সব ১২৮টি ফ্ল্যাটকে জীর্ণ ঘোষণা করে এবং বাসিন্দাদের সেখান থেকে সরে যাওয়ার আবেদন জানায়।

এরপর ফ্ল্যাটগুলোতে নোটিস সাঁটানো এবং লাউডস্পিকারের মাধ্যমে ভবন খালি করার বিষয়ে বাসিন্দাদের জানানো হয়। কর্তৃপক্ষের সমীক্ষায় একাধিক ফ্ল্যাটে অতিরিক্ত এবং কথিত বেআইনি নির্মাণের বিষয়টিও সামনে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলত একটি ঘরের জন্য তৈরি কিছু ফ্ল্যাট বাড়িয়ে দুটি ঘর করা হয়েছিল। কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, এই ধরনের পরিবর্তন ভবনের কাঠামোগত দৃঢ়তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবকেও ভবনগুলোর খারাপ অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।

দিল্লিতে সাম্প্রতিক ভবন দুর্ঘটনার পর নয়ডায় পুরনো ও দুর্বল বাড়িগুলোর পরীক্ষা আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। দিল্লির সত্য নিকেতনে পাঁচতলা ভবন ধসের ঘটনায় সাতজনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছিল। এই ঘটনার পর দিল্লি-এনসিআরের অন্যান্য শহরেও জীর্ণ ও অননুমোদিত নির্মাণ নিয়ে প্রশাসনিক সতর্কতা বেড়েছে। নয়ডাতেও কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দিকে এগিয়েছে।

নয়ডার সদরপুর, মামুরা, নিঠারি এবং সালারপুরের মতো এলাকায় গত কয়েক বছরে জনসংখ্যা এবং ভাড়ার আবাসনের দ্রুত বিস্তার হয়েছে। কম জায়গায় বহু তলা ভবনও এখানে দেখা যায়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মামুরা, ছলেরা, সদরপুর এবং রসুলপুর নওয়াদার পিজি ক্লাস্টারগুলিতে এমন বহুতল ভবনের দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে, যেখানে স্থানীয় জমি ব্যবহারের নিয়ম অনুযায়ী কম তলার অনুমতি থাকা সত্ত্বেও অনেক জায়গায় ছয়, সাত এবং এমনকি নয়তলা নির্মাণের কথা সামনে এসেছে।

এই ধরনের এলাকায় ভবনের নিরাপত্তা শুধু ভবনের বয়সের ওপর নির্ভর করে না। নির্মাণের গুণমান, ব্যবহৃত উপকরণ, ভবনের মূল নকশায় পরিবর্তন, অতিরিক্ত তলা বা ঘর নির্মাণ, কলাম ও বিমের অবস্থা, জল চুঁইয়ে পড়া, ছাদের পরিস্থিতি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মতো একাধিক বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাই নয়ডা কর্তৃপক্ষের সমীক্ষা শুধু পুরনো বাড়ি চিহ্নিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবনের প্রকৃত কাঠামোগত পরিস্থিতির পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজ। সরু গলিতে যদি একাধিক তলা ভবন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে এবং রাস্তার ওপর দিয়ে বিদ্যুতের তারও যায়, তাহলে আগুন, ভবন ধস বা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় দমকল ও অ্যাম্বুল্যান্সকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সমস্যা হতে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নয়ডার কয়েকটি পিজি এলাকায় জরুরি নির্গমনপথ এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

মামুরায় জুলাই ২০২৬-এ ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডও ঘনবসতিপূর্ণ ভবনের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছিল। একটি বহুতল আবাসিক ভবনে আগুন লাগার পর বহু মানুষকে উদ্ধার করতে হয় এবং দুজনের মৃত্যু হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক বাইকে স্পার্কিংয়ের পর আগুন লাগে। এই ঘটনাগুলোর মধ্যে জীর্ণ ভবনের পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ বহুতল বাড়িগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।

সেক্টর-৩১-এর ১২৮টি ফ্ল্যাটের পরিস্থিতি এই পদক্ষেপের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। এই ফ্ল্যাটগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ বসবাস করছেন এবং বহু পরিবারের পক্ষে হঠাৎ বাড়ি খালি করা সহজ নয়। কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়ি খালি করার পরামর্শ দিয়েছে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামনে বিকল্প আবাসনের প্রশ্নও রয়েছে। উপলব্ধ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ফ্ল্যাটগুলোতে বিভিন্ন সরকারি বিভাগের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাও বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে বিএসএনএল, ডাক বিভাগ এবং পুলিশ বিভাগের কর্মী রয়েছেন।

এই কারণে পরবর্তী পদক্ষেপ শুধু নোটিস জারি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাড়ি খালি করার পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী পরিবারগুলোর পরিস্থিতিও দেখতে হবে এবং নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য তাঁদের কতটা সময় দেওয়া হবে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। জীর্ণ ভবনে মানুষকে বসবাস করতে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে নিরাপদ পুনর্বাসন বা বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা ছাড়া হঠাৎ বাড়ি খালি করানোর পদক্ষেপ পরিবারগুলোর জন্য নতুন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

নয়ডা কর্তৃপক্ষের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমীক্ষায় চিহ্নিত প্রতিটি ভবনের প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন করা। কোনো ভবনে শুধু প্লাস্টার খসে পড়া এবং কোনো ভবনের কাঠামোগত দৃঢ়তা নষ্ট হয়ে যাওয়া একই পরিস্থিতি নয়। বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কোন বাড়ি অবিলম্বে খালি করানো প্রয়োজন, কোন ভবনের মেরামতের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব এবং কোন ভবন পুরোপুরি সরিয়ে পুনর্নির্মাণ করা দরকার, তা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

পুরনো বাড়িতে জল চুঁইয়ে পড়াও কাঠামোগত দৃঢ়তার জন্য গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। বর্ষাকালে লাগাতার বৃষ্টির ফলে ছাদ ও দেওয়ালে আর্দ্রতা বাড়ে। ভবনের নির্মাণ আগে থেকেই দুর্বল হলে দীর্ঘ সময় ধরে জলের প্রভাব ভবনের বিভিন্ন অংশের ক্ষতি করতে পারে। এই কারণে বর্ষাকালে জীর্ণ ভবনের পরীক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সমীক্ষায় অননুমোদিত নির্মাণও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। মূল নকশা অনুযায়ী তৈরি ভবনে পরে অতিরিক্ত ঘর, তলা, বারান্দা বা ভারী কাঠামো যোগ করা হলে ভবনের ওপর অতিরিক্ত ভার পড়তে পারে। সেক্টর-৩১-এর জনতা ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের সমীক্ষায় কিছু ফ্ল্যাটের মূল কাঠামোয় পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত নির্মাণের বিষয়টি সামনে এসেছিল।

নয়ডায় দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা এবং ভাড়ার আবাসনের চাহিদা এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। বিপুল সংখ্যক ছাত্র, চাকরিজীবী এবং অন্য শহর থেকে আসা কর্মীরা সস্তা পিজি বা ভাড়ার ঘর খোঁজেন। এর ফলে কিছু এলাকায় ছোট জমিতে বেশি তলা নির্মাণ অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ভবন নির্মাণের নিয়ম এবং কাঠামোগত নিরাপত্তা উপেক্ষা করা হলে এই ব্যবস্থা পরবর্তীতে গুরুতর ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

দিল্লির ঘটনার পর নয়ডায় নেওয়া পদক্ষেপকে এই বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা। কোনো ভবনে গুরুতর ফাটল, হেলে থাকা অংশ, দুর্বল কলাম, ক্ষতিগ্রস্ত ছাদ বা অন্যান্য কাঠামোগত ত্রুটি থাকলে সময়মতো সেখানকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা যেতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও এই অভিযানের গুরুত্ব রয়েছে। অনেক সময় পুরনো বাড়িতে বসবাসকারী মানুষ ফাটল বা খসে পড়া প্লাস্টারকে স্বাভাবিক ঘটনা ধরে উপেক্ষা করেন। কিন্তু ভবনের কাঠামোয় ধারাবাহিক পরিবর্তন হলে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। শুধু বাইরের রং বা প্লাস্টার মেরামত করে সব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয় না।

কর্তৃপক্ষের সমীক্ষার মাধ্যমে শহরে এমন ভবনগুলোর রেকর্ডও তৈরি হতে পারে, যেগুলোকে ভবিষ্যতে বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখতে হবে। এর ফলে বৃষ্টি বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় প্রশাসনের কাছে আগে থেকেই জানা থাকবে কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি। জরুরি পরিষেবার পরিকল্পনা তৈরিতেও এই ধরনের রেকর্ড কাজে আসতে পারে।

বর্তমানে সদরপুর থেকে মামুরা এবং আশপাশের অন্যান্য এলাকায় জীর্ণ ভবন চিহ্নিত করা এবং নোটিস জারির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যার লক্ষ্য সম্ভাব্য দুর্ঘটনা রোধ করা। একই সঙ্গে সেক্টর-৩১-এর ১২৮টি জনতা ফ্ল্যাটের ঘটনা ইতিমধ্যে জীর্ণ ঘোষিত ভবনগুলোর পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। ২০২৫ সালে ছাদ ধসের ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ এই ফ্ল্যাটগুলোর বিষয়ে সতর্ক করেছিল এবং এখন সেগুলো খালি করানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

দিল্লির দুর্ঘটনার পর নয়ডায় শুরু হওয়া এই পদক্ষেপ শহরের ভবন নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সমীক্ষা যদি শুধু নোটিস জারি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, বেআইনি নির্মাণ চিহ্নিত করা, মেরামত বা পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপদ ব্যবস্থা পর্যন্ত এগিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা রোধে তা সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে নজর রয়েছে সমীক্ষায় কতগুলি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ পরবর্তী পর্যায়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়।

Leave a comment