রান্নাঘরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সবজি পেঁয়াজ। তাই এর দাম সামান্য বাড়লেই তার প্রভাব পড়ে সাধারণ পরিবারের মাসিক বাজেটে। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পেঁয়াজের দাম বাড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। কিন্তু এর পিছনে কি শুধুই বাজারের চাহিদা দায়ী? আসলে পেঁয়াজের উৎপাদন ও সরবরাহের নির্দিষ্ট চক্রই এই সময়ের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
এক বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে পাইকারি দাম
গত কয়েক দিনে পেঁয়াজের দাম দ্রুত বেড়েছে। উপভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ পেঁয়াজের পাইকারি দাম ছিল প্রতি কুইন্টাল ₹৪,৬১৫.৯৮। এক বছর আগে একই সময়ে এই দাম ছিল ₹৩,২৯৯.৮৫।অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে খুচরো বাজারেও দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এক মাসে কেজিতে কতটা দাম বাড়ল?
পেঁয়াজের গড় খুচরো দামও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছুটা বেড়েছে। এক মাস আগে প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড় দাম ছিল ₹৪০.৭৯। ২১ সেপ্টেম্বর সেই দাম বেড়ে হয়েছে ₹৫৪.২৩।ফলে মাত্র এক মাসের ব্যবধানেই প্রতি কেজিতে প্রায় ₹১৩.৪৪ দাম বেড়েছে। বাজারে পেঁয়াজের জোগান কমে গেলে খুচরো দামে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পেঁয়াজের দাম কেন বাড়ে?
এই সময়ের মূল্যবৃদ্ধি বোঝার জন্য পেঁয়াজের উৎপাদন চক্র সম্পর্কে জানা জরুরি। সাধারণত মার্চ-এপ্রিল থেকে রবি মরশুমের পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করে। এই ফসলের একটা অংশ সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে বাজারে সরবরাহ করা হয়।কিন্তু পরবর্তী খরিফ মরশুমের পেঁয়াজ বাজারে আসার আগে পুরনো মজুতের উপরেই অনেকটা নির্ভর করতে হয়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে এসে সেই পুরনো মজুত কমতে শুরু করলে বাজারে সরবরাহও চাপের মুখে পড়ে।ফলে চাহিদার তুলনায় জোগান কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে।
গরম ও অসময়ের বৃষ্টির প্রভাব
এবারের দামবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আবহাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। অতিরিক্ত গরম এবং অসময়ে বৃষ্টির কারণে মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষে প্রভাব পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।মহারাষ্ট্র দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল। সেখানে ফলন বা সংরক্ষণে সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব দেশের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরো বাজারে পড়তে পারে।
সরকারি মজুতেও নষ্ট হয়েছে পেঁয়াজ
শুধু মাঠের উৎপাদন নয়, সংরক্ষিত পেঁয়াজের পরিমাণও বাজারের দামের উপর প্রভাব ফেলে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সরকারি সংস্থাগুলির মজুত করা পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে।মজুত কমে গেলে বাজারে সরবরাহের চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নতুন মরশুমের ফসল পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে না আসা পর্যন্ত এই ঘাটতির প্রভাব দামে দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশে উৎপাদনের প্রভাবও রয়েছে
পেঁয়াজের বাজারে আঞ্চলিক সরবরাহ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে বাংলাদেশেও পেঁয়াজের উৎপাদন হচ্ছে। ফলে সীমান্তবর্তী বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।অর্থাৎ, পেঁয়াজের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ভারতের উৎপাদন নয়, আশপাশের বাজারের পরিস্থিতিও কখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফসলের চক্রই বড় কারণ
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি হল ফসলের চক্র ও সরবরাহের ব্যবধান। রবি মরশুমের ফসল বাজারে আসার পর কয়েক মাস সেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নতুন খরিফ ফসল বাজারে আসার আগের সময়ে পুরনো মজুত কমে গেলে সরবরাহে টান তৈরি হতে পারে।এর সঙ্গে আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন বা সংরক্ষণে ক্ষতি এবং সরকারি মজুত কমে যাওয়ার মতো বিষয় যুক্ত হলে বাজারে দাম আরও বাড়তে পারে।
সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস এলেই পেঁয়াজের বাজারে দামের ওঠানামা চোখে পড়ে। ২০২৬ সালেও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২১ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজের গড় খুচরো দাম প্রতি কেজি ₹৫৪.২৩-এ পৌঁছেছে, যেখানে এক মাস আগে ছিল ₹৪০.৭৯। পাইকারি বাজারেও এক বছরে উল্লেখযোগ্য দামবৃদ্ধি হয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে ফসলের চক্র, পুরনো মজুত কমে যাওয়া, আবহাওয়ার প্রভাব এবং সরবরাহের পরিবর্তন।













