কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ভারতের সর্বশেষ GDP বৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তোলা সমালোচকদের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমালোচনাকারীরা তথ্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছেন এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের GDP বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ নথিভুক্ত হয়েছে।
দিল্লিতে অটোমোটিভ কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (ACMA)-এর একটি বৈঠকে গোয়েল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের পক্ষে সওয়াল করেন। বক্তব্যে তিনি প্রাক্তন ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) গভর্নর রঘুরাম রাজনের নাম সরাসরি নেননি, তবে তাঁর কার্যকাল এবং অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের তুলনা নিয়ে মন্তব্য করেন।
পীযূষ গোয়েল বলেন, কিছু মানুষ ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর দাবি, এই ধরনের মানুষের কাছে এখন টেলিভিশন বিতর্কে গিয়ে যুক্তি দেওয়াই একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মন্ত্রী বিরোধী দল এবং সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচকদের বিরুদ্ধে ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ করেন।
গোয়েল আরও বলেন, অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সামনে আসা বাস্তবতাকে আড়াল করা যায় না। তাঁর মতে, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ভারতের অর্থনৈতিক সাফল্যকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রাক্তন RBI গভর্নরের নাম না নিয়ে তিনি বলেন, সমালোচকদের মধ্যে এমন মানুষও থাকতে পারেন যারা ভারতে নিজেদের কার্যকাল শেষ করতে পারেননি এবং যারা পরিসংখ্যানের তুলনা করতে জানেন না।
রঘুরাম রাজনের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পরেই গোয়েলের এই বক্তব্য এসেছে। রাজন ভারতের GDP বৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
প্রাক্তন RBI গভর্নর রঘুরাম রাজন GDP-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, অর্থনীতি যদি এত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, তাহলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একই অনুপাতে উন্নতি দেখা যাচ্ছে না কেন।
রাজন GDP পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পরিসংখ্যান যদি প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত না করে, তাহলে গোটা অর্থনীতির মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
তিনি কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রাজনের প্রশ্ন ছিল, অর্থনীতি যদি দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায়, তাহলে সংস্থাগুলি বড় আকারে বিনিয়োগ করছে না কেন এবং ভারতে পর্যাপ্ত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা FDI আসছে না কেন।
সরকারের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের GDP বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান RBI-এর পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ওই সময়ে ৭ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল।
গত বছরের একই ত্রৈমাসিকে GDP বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৯ শতাংশ।
সরকার এই বৃদ্ধিকে ভারতীয় অর্থনীতির সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রমাণ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, সমালোচকদের বক্তব্য, শুধুমাত্র GDP বৃদ্ধির হার দিয়ে অর্থনীতির সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। কর্মসংস্থান, আয়, বিনিয়োগ এবং ভোগের মতো সূচকগুলিকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
GDP-এর পরিসংখ্যান প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম X-এ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে চলমান চ্যালেঞ্জ এবং তেলের বাড়তে থাকা দামের মধ্যেও প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারত ৭.৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী এটিকে দেশের মানুষের শক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ফল হিসেবে উল্লেখ করেন। সরকারের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতের এই প্রবৃদ্ধি দেশকে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলির মধ্যে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করতে পারে।
GDP-এর পরিসংখ্যান নিয়ে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে সরকারের সমালোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক দাবির বিষয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
খড়গে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করে GDP বৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার দাবি জানান। GDP-এর পরিসংখ্যানকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
GDP বা Gross Domestic Product একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের অর্থনীতিতে উৎপাদিত পণ্য এবং সরবরাহ করা পরিষেবার মোট অর্থনৈতিক মূল্যকে নির্দেশ করে। এটি সাধারণত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিমাপের অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
GDP-এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন এবং পরিষেবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর মধ্যে দেশীয় সংস্থার পাশাপাশি দেশে উৎপাদনকারী বিদেশি সংস্থাগুলির কর্মকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
![]()
তবে GDP একটি অর্থনীতির সম্পূর্ণ চিত্র দেয় না। বেকারত্ব, মাথাপিছু আয়, মূল্যবৃদ্ধি, আয়ের বণ্টন এবং বিনিয়োগের মতো অন্যান্য সূচকও অর্থনীতির পরিস্থিতি বোঝার জন্য বিবেচনা করা হয়।GDP বোঝার ক্ষেত্রে রিয়েল এবং নোমিনাল GDP-এর পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। রিয়েল GDP-তে মূল্যের প্রভাব বাদ দিয়ে উৎপাদনের প্রকৃত বৃদ্ধিকে পরিমাপ করার চেষ্টা করা হয়। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে প্রকৃত উৎপাদন কতটা বেড়েছে তা বোঝা যায়।
অন্যদিকে, নোমিনাল GDP বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এতে পণ্য ও পরিষেবার দামের পরিবর্তনও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে মূল্যবৃদ্ধি হলে নোমিনাল GDP-তে বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে, যদিও প্রকৃত উৎপাদন একই হারে না-ও বাড়তে পারে।
সাধারণত GDP বোঝাতে ব্যয়ভিত্তিক সূত্র ব্যবহার করা হয়:
এখানে C-এর অর্থ ব্যক্তিগত ভোগ, অর্থাৎ মানুষ ও পরিবারগুলির করা ব্যয়। G সরকারের করা ব্যয়কে নির্দেশ করে। I-এর অর্থ ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং NX বা নেট এক্সপোর্ট রফতানি ও আমদানির মধ্যকার পার্থক্য নির্দেশ করে।
এই উপাদানগুলির পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি বোঝা যায়।
ভারতে GDP গণনার জন্য বেস ইয়ার ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক সংশোধিত GDP সিরিজে ২০২২-২৩-কে নতুন বেস ইয়ার করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য অর্থনীতির বর্তমান কাঠামো এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক প্রবণতাকে আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত করা।
বেস ইয়ার হলো সেই রেফারেন্স বছর, যার মূল্য এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ভিত্তি করে প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূল্যায়ন করা হয়। সময়ের সঙ্গে অর্থনীতির কাঠামো পরিবর্তিত হওয়ায় বেস ইয়ার আপডেট করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে, কোনও পণ্যের দাম কয়েক বছরে দ্বিগুণ হয়ে গেলেও তার উৎপাদন একই থাকলে শুধুমাত্র দামের ভিত্তিতে অর্থনীতির প্রকৃত প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা সঠিক হবে না। রিয়েল GDP-তে দামের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করে উৎপাদনের প্রকৃত পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করা হয়।
ভারতের GDP বৃদ্ধি নিয়ে চলমান বিতর্কে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সরকার শক্তিশালী GDP বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার সূচক হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, এর প্রভাব কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগে কতটা দেখা যাচ্ছে।
রঘুরাম রাজনের প্রশ্ন এই পার্থক্যকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, পীযূষ গোয়েলের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, সরকারি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে খারিজ করা উচিত নয়।
বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে ভারতের GDP বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, রফতানি এবং বিদেশি বিনিয়োগের মতো সূচকও গুরুত্বপূর্ণ।










