প্রধানমন্ত্রী মোদি সচিবদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সমন্বয়, প্রশাসনিক সংস্কার ও সাইবার নিরাপত্তার ওপর জোর দিলেন

প্রধানলোচনা বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সংস্কার, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং নাগরিককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মঙ্গলবার নয়াদিল্লির ৭, লোক কল্যাণ মার্গে অবস্থিত তাঁর সরকারি বাসভবনে ভারত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের সঙ্গে দ্বিতীয় উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক করেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে চলমান প্রচেষ্টার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনাকে আরও কার্যকর করা। বৈঠকে অর্থ ও অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক সংস্কারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে অর্থ ও অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প এবং প্রযুক্তি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর অগ্রগতিও মূল্যায়ন করা হয়।

সরকার বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আরও উন্নত সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এবং নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, যে কোনও বৃহৎ জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের জন্য সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় অপরিহার্য। তিনি কর্মকর্তাদের দলগতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান অনুভূমিক (Horizontal) ও উল্লম্ব (Vertical) প্রতিবন্ধকতা দূর করা সময়ের দাবি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব বিভাগ যদি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে। তিনি ফলাফলভিত্তিক কর্মসংস্কৃতি গ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করার পরামর্শ দেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে সরকারের প্রতিটি নীতি ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে দেশের সাধারণ নাগরিক থাকা উচিত। তিনি বলেন, শাসনব্যবস্থার সাফল্য তখনই নিশ্চিত হবে, যখন তার প্রত্যক্ষ সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং নাগরিকদের জীবনমানের বাস্তব উন্নতি প্রতিফলিত হবে।

তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, সরকারি প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য যেন কেবল প্রশাসনিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের প্রত্যাশা পূরণে নিবেদিত থাকে। প্রধানমন্ত্রী সেবাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনকে উন্নত ভারতের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ভারত বর্তমানে সড়ক, রেল, বন্দর, বিমানবন্দর এবং ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগ করছে। তবে তিনি বলেন, শুধুমাত্র ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন যথেষ্ট নয়।

তিনি কর্মকর্তাদের স্বদেশি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য অপরিহার্য।

বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তাও অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, শিল্পোন্নয়ন এবং নাগরিক কল্যাণের সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।

তিনি জ্বালানি ক্ষেত্রে উদ্ভাবন, বহুমুখী জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, ভারতকে আত্মনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, সংস্কার (Reforms)-কে কেবল একটি জনপ্রিয় শব্দ বা সাময়িক উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তিনি এটিকে কার্যকর শাসনব্যবস্থার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে সরকারি কার্যপ্রণালীকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্কৃতির উন্নয়ন এবং নতুন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে ধারাবাহিকভাবে হালনাগাদ করার আহ্বান জানান।

ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরকারি পরিষেবা যত বেশি ডিজিটাল হচ্ছে, সাইবার ঝুঁকিও তত বাড়ছে।

তিনি কর্মকর্তাদের ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি যুবসমাজ, স্টার্টআপ এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমাধান উন্নয়নে উৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো সম্পর্কে ভুল তথ্য ও গুজবের কার্যকর মোকাবিলায় সক্রিয় জনসংযোগ ও যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, যেসব ক্ষেত্রে দেশ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেসব বিষয়ে স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী তথ্য ভাগ করে নেওয়া জরুরি, যাতে জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছায় এবং বিভ্রান্তির পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।

 

Leave a comment