ইটভাটার শ্রমিক বাবার সন্তান, হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা! আজ বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মুখ রাধামাধব মণ্ডল

ইটভাটার শ্রমিক বাবার সংসারে অভাবের মধ্যে বড় হয়েছেন রাধামাধব মণ্ডল। হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করে আজ বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মুখ। জানুন তাঁর অনুপ্রেরণার গল্প।

অভাব কখনও তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। বাড়িতে ছিল না পর্যাপ্ত আলো, বই কেনার টাকাও ছিল না। বাবা ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন। এমন প্রতিকূল পরিবেশে হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করে একদিন লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের গোপালপুর গ্রামের রাধামাধব মণ্ডল। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আজ তিনি বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মুখ। তাঁর লেখায় উঠে আসে গ্রামবাংলা, লোকসংস্কৃতি এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন।

ইটভাটার শ্রমিক বাবার সন্তান, হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা! আজ বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মুখ রাধামাধব মণ্ডল
অভাবের সংসারেই বেড়ে ওঠা

গোপালপুর গ্রামের সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা রাধামাধবের শৈশব কেটেছে নানা অভাবের মধ্যে। তাঁর বাবা ছিলেন ইটভাটার শ্রমিক। সংসারের আর্থিক পরিস্থিতি এমন ছিল যে নিয়মিত পড়াশোনা চালানোও সহজ ছিল না।নতুন বই কেনা তো দূরের কথা, ভালো পোশাক পরার সুযোগও সবসময় মিলত না। তাঁর পড়াশোনার আগ্রহ দেখে অনেক সময় শিক্ষকরা নিজেরাই বই কিনে সাহায্য করেছেন। সেই সহায়তা এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

হারিকেনের আলোয় শুরু লেখালেখি

প্রায় ২৮ বছর আগে নিজের গ্রামে বসেই লেখালেখির জগতে পা রাখেন রাধামাধব। তখন কোনও বড় পরিকাঠামো বা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ছিল না। হারিকেনের আলোয় বসে লিখতেন নিজের কথা, নিজের দেখা সমাজের কথা।জীবনের নানা বাধা এলেও কলম থামাননি তিনি। বিয়ের পর এক প্রকাশকের আর্থিক সহযোগিতায় বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেন।পরবর্তীতে একাধিক চাকরির সুযোগ এলেও শেষ পর্যন্ত লেখালেখিকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন রাধামাধব। আজ সাহিত্যচর্চাই তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন।

ইটভাটার শ্রমিক বাবার সন্তান, হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা! আজ বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মুখ রাধামাধব মণ্ডল
স্ত্রী রাখীকেও দিয়েছিলেন অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের কথা

রাধামাধবের ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে অনুপ্রেরণার গল্প। তাঁর প্রেমিকা তথা পরবর্তীকালে স্ত্রী রাখীকে একসময় তিনি বলেছিলেন, তাঁকে বিয়ে না করলে ভবিষ্যতে আফসোস করতে হতে পারে।কারণ, নিজের প্রতিভা এবং পরিশ্রমের উপর তাঁর প্রবল আস্থা ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন তাঁর সাহিত্যকর্ম আন্তর্জাতিক স্তরেও স্বীকৃতি পাবে। পাশাপাশি সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে গবেষণামূলক কাজের জন্য বড় সম্মান পাওয়ার স্বপ্নও দেখতেন।সেই সময় তাঁর এমন আত্মবিশ্বাসের কথা শুনে অবাক হয়েছিলেন রাখী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রাধামাধবের সাফল্যই তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বামীর অর্জনে আজ গর্বিত রাখীও।

দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশিত

বর্তমানে শুধু বাংলার বিভিন্ন সংবাদপত্র বা পত্রিকাতেই নয়, দেশ-বিদেশের নানা প্রকাশনাতেও নিয়মিত লেখেন রাধামাধব মণ্ডল।তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সমাজের প্রান্তিক মানুষ এবং হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা। লোকসংস্কৃতি, অচর্চিত ইতিহাস এবং গ্রামীণ জীবনের নানা অনুষঙ্গ তাঁর গবেষণামূলক লেখায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।তাঁর একাধিক গল্প অবলম্বনে বাংলা সিনেমাও তৈরি হয়েছে। তাঁর লেখা গানও গেয়েছেন দুই বাংলার জনপ্রিয় শিল্পীরা।

ইটভাটার শ্রমিক বাবার সন্তান, হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা! আজ বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মুখ রাধামাধব মণ্ডল
গল্প, উপন্যাস থেকে গান—সবেতেই স্বচ্ছন্দ

রাধামাধব শুধু লেখক নন, তাঁর সৃষ্টির পরিধিও যথেষ্ট বিস্তৃত। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নাটক, গবেষণাধর্মী লেখা এবং গান—বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি নিয়মিত কাজ করেছেন।বিশেষ করে লোকজীবনকে কেন্দ্র করে তাঁর কাজের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে। শহরের সাহিত্যচর্চার বাইরে গ্রামের মাটিতে বসেও যে মূলধারার সাহিত্য সৃষ্টি করা সম্ভব, তাঁর পথচলা তারই উদাহরণ।

হারিয়ে যাওয়া বাংলাকে লেখায় ধরে রাখার চেষ্টা

বাংলার মহিলাদের স্মৃতিচর্চা থেকে টহলগান, ডাকাতদের ইতিহাস থেকে লোকরান্না—বিভিন্ন অচর্চিত বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন রাধামাধব।তাঁর লেখায় উঠে এসেছে বাউল সংস্কৃতি, বহুরূপী, ঠগি, হানাবাড়ি, কীর্তনের হারিয়ে যাওয়া গ্রাম, শববাহকের গান, দেওয়াল লিখন, লোকছড়া, গৃহসজ্জা, উনুন সংস্কৃতি, লোকউৎসব এবং গ্রামীণ লোকজীবিকার মতো বহু বিষয়।হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নথিবদ্ধ করে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই যেন তাঁর লেখালেখির অন্যতম উদ্দেশ্য।

অভাব থেকে সাফল্যের এই গল্প কেন আলাদা?

রাধামাধব মণ্ডলের জীবন দেখিয়ে দেয়, লেখক হওয়ার জন্য শুধুমাত্র শহুরে সুযোগ-সুবিধা বা বড় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে যাওয়ার মানসিকতা।ইটভাটার শ্রমিক বাবার সন্তান থেকে বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার এই যাত্রাপথ তাই শুধু একজন লেখকের সাফল্যের গল্প নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জিতে যাওয়ারও এক অনুপ্রেরণামূলক কাহিনি।

ইটভাটার শ্রমিক বাবার সন্তান, হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা! আজ বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মুখ রাধামাধব মণ্ডল
পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের প্রত্যন্ত গোপালপুর গ্রামের ছেলে রাধামাধব মণ্ডল। ছোটবেলায় ছিল চরম আর্থিক অনটন, বাবা কাজ করতেন ইটভাটায়। বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করেই লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে আজ বাংলা সাহিত্যের পরিচিত নাম রাধামাধব।

Leave a comment