উত্তরাখণ্ডের অঙ্কিতা ভাণ্ডারী হত্যা মামলায় ন্যায়বিচারের দাবিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে বিজেপি নেতা দুষ্যন্ত কুমার গৌতমের সিকিমের রাজ্যপাল পদে নিয়োগ ও দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, অঙ্কিতার বাবা-মাও তাঁর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারের কাছে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দলিত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিরা কংগ্রেস নেতৃত্বকে একটি খোলা চিঠি লিখে রাজনৈতিক নৈতিকতা ও সমান মানদণ্ড অনুসরণের আবেদন জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাহুল গান্ধী রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে অঙ্কিতা ভাণ্ডারী হত্যা মামলার তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত দুষ্যন্ত কুমার গৌতমকে সিকিমের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে না দেওয়ার দাবি জানান। অঙ্কিতার পরিবারের উত্থাপিত প্রশ্ন এবং তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে তাদের উদ্বেগ এই দাবির কেন্দ্রে রয়েছে।
পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ্যে আনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত বিষয়গুলি তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের বক্তব্য, উত্থাপিত প্রশ্নগুলির উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ দূর হবে না।
তবে দুষ্যন্ত কুমার গৌতমের নিয়োগ স্থগিত রাখার দাবি নিজে থেকে কোনও অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে না। অভিযোগ, তদন্তের ফলাফল এবং কোনও ব্যক্তির আইনি দায়বদ্ধতার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক সম্মেলন করে অঙ্কিতা ভাণ্ডারীর বাবা-মা তাঁদের দাবিগুলি পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁরা সরকারকে দুষ্যন্ত কুমার গৌতমের রাজ্যপাল পদে নিয়োগ স্থগিত রাখার পাশাপাশি মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার আবেদন জানান। দাবিগুলির বিষয়ে পদক্ষেপ করার জন্য তাঁরা সরকারকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমাও বেঁধে দেন।
অঙ্কিতার মা বলেন, তাঁর লড়াই মেয়েকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য। তিনি এই সংগ্রামকে শুধু নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি মেয়ের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন। পরিবারের প্রধান দাবি, মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক এবং যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি, সেগুলির সমাধান করা হোক।
অঙ্কিতার বাবা-মা ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে অজয় কুমার এবং দুষ্যন্ত কুমারের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ও কল রেকর্ড প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। পরিবারের মতে, এই তথ্যগুলি পরীক্ষা করলে ঘটনার ক্রমপরম্পরা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
মামলার প্রধান অভিযুক্ত পুলকিত আর্যর পুরনো মোবাইল ফোন বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) উদ্ধার করেছিল কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা। এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অঙ্কিতার বাবা-মা।
এ ছাড়া, রিসর্টটি ভেঙে ফেলার পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। কোন পরিস্থিতিতে এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল এবং এর ফলে মামলার সম্ভাব্য প্রমাণের ওপর কোনও প্রভাব পড়েছিল কি না, তা জানতে চেয়েছেন তাঁরা। সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা ও প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সামনে এলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
অঙ্কিতা ভাণ্ডারী উত্তরাখণ্ডের একটি রিসর্টে অভ্যর্থনাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর হত্যার ঘটনা সামনে আসে। এই ঘটনা নারীদের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কথিত ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি করেছিল।
২০২২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর চিল্লা খাল থেকে অঙ্কিতার দেহ উদ্ধার করা হয়। এই মামলায় রিসর্টের মালিক পুলকিত আর্য এবং দুই কর্মী সৌরভ ভাস্কর ও অঙ্কিত গুপ্তকে গ্রেফতার করা হয়।
২০২৫ সালের ৩০ মে কোটদ্বারের আদালতে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক রীনা নেগি তিন অভিযুক্তকে হত্যা এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
মামলায় এক কথিত VIP-এর ভূমিকা নিয়েও ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে। উপলব্ধ বিবরণ অনুযায়ী, ওই VIP-এর পরিচয় প্রকাশ্যে আসেনি। অঙ্কিতার পরিবার এই দিকটিরও স্পষ্ট তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
অঙ্কিতার পরিবার দুষ্যন্ত কুমার গৌতমের কথিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে সিকিমের রাজ্যপাল পদে তাঁর নিয়োগের বিরোধিতা করা হচ্ছে। পরিবারের আবেদন, মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত প্রশ্নের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর নিয়োগ স্থগিত রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হোক।
মামলাটির তদন্ত কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (CBI) হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলেও তথ্য সামনে এসেছে। তবে তদন্তের বর্তমান অবস্থা, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে উপলব্ধ প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আনুষ্ঠানিক নথির ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন।
কোনও নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বা জনপরিসরে আপত্তি এবং কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগতভাবে প্রমাণিত অভিযোগ এক বিষয় নয়। তাই তদন্তে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার দাবি জানানোর পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান বজায় রাখাও জরুরি।
অঙ্কিতাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার দাবিতে তাঁর পরিবার দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে বিক্ষোভ করে। উপলব্ধ বিবরণ অনুযায়ী, বুধবার রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও পরিবারের সমর্থনে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছেছিলেন।
![]()
এরপর বৃহস্পতিবার ভোর প্রায় চারটের সময় বিক্ষোভে যুক্ত কয়েকজনকে আটক করার খবর সামনে আসে। প্রায় দুই ঘণ্টা পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর মামলাটি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। পরিবারের দাবি, তাঁদের বক্তব্য শোনা হোক এবং মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়া হোক।
অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলায় কংগ্রেসের সক্রিয়তার মধ্যে বৃহস্পতিবার দলিত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সংগঠনের প্রতিনিধিরা কংগ্রেস নেতৃত্বকে একটি খোলা চিঠি লেখেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, যে রাজনৈতিক দল সাংবিধানিক নৈতিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলে, তাদের রাজনৈতিক আচরণেও এই মূল্যবোধ অনুসরণ করা উচিত। চিঠির লেখকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশানা করার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক নৈতিকতার নীতিগুলি বেছে বেছে প্রয়োগ করা উচিত নয়।
চিঠির মাধ্যমে কংগ্রেসকে নিজেদের অবস্থান ও আচরণে সমান মানদণ্ড অনুসরণের আবেদন জানানো হয়েছে। ফলে অঙ্কিতা মামলাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক এখন তদন্ত ও নিয়োগের প্রশ্নের পাশাপাশি রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়গুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।
CJP-এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে অঙ্কিতার বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, মেয়েকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য লড়াই করা বাবা-মায়ের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা উচিত নয়।
তাঁর মন্তব্যে মামলাটির মানবিক দিকটি উঠে এসেছে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবারের উদ্বেগ শোনা, তাদের দাবির স্পষ্ট উত্তর দেওয়া এবং তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সরবরাহ করা সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলায় এখন সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলির প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর রয়েছে। পরিবারের তরফে কল রেকর্ড, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য, মোবাইল ফোন উদ্ধার এবং রিসর্ট ভেঙে ফেলার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে দুষ্যন্ত কুমার গৌতমের রাজ্যপাল পদে নিয়োগ স্থগিত রাখার দাবিও জানানো হয়েছে।
পরিবারের উদ্বেগের উত্তর কীভাবে দেওয়া হয় এবং তদন্তের তথ্য কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করা হয়, তা পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক তথ্য, উপলব্ধ প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়াকে ভিত্তি করা প্রয়োজন।
অঙ্কিতার বাবা-মায়ের ন্যায়বিচারের দাবি, রাহুল গান্ধীর রাষ্ট্রপতিকে লেখা চিঠি এবং কংগ্রেস নেতৃত্বকে পাঠানো খোলা চিঠি মামলাটিকে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতেই পরবর্তী পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।












