রথযাত্রা এলেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় বাংলার এক প্রাচীন বৈষ্ণব ঐতিহ্য—‘রাঘবের ঝালি’। প্রায় ৫০০ বছর আগে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্য যে ভোগের ঝুড়ি নিয়ে পুরীতে যেতেন তাঁর প্রিয় ভক্ত রাঘব পণ্ডিত, সেই ঐতিহ্য আজও অটুট। পানিহাটির ঐতিহাসিক রাঘব ভবন থেকে এবারও নানা ধরনের ভোগসামগ্রী সাজিয়ে পাঠানো হচ্ছে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে।
কী এই ‘রাঘবের ঝালি’?
‘রাঘবের ঝালি’ হল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উদ্দেশে নিবেদিত এক বিশেষ ভোগের ঝুড়ি। ইতিহাস অনুযায়ী, মহাপ্রভুর অন্যতম প্রিয় পার্ষদ রাঘব পণ্ডিত প্রতিবছর রথযাত্রার সময় বাংলার ভক্তদের সঙ্গে পুরী যেতেন। তাঁর সঙ্গে থাকত একটি ঝুড়ি, যাতে বছরের পর বছর সংরক্ষণযোগ্য নানা খাদ্যসামগ্রী যত্ন করে তৈরি করে দিতেন তাঁর বোন দময়ন্তী দেবী।এই ঝালি শুধুমাত্র খাদ্য নয়, বৈষ্ণব ভক্তি, সেবা ও আত্মনিবেদনের এক অনন্য প্রতীক বলেই বিবেচিত।
রাঘবের ঝালিতে কী কী ভোগ থাকে
ঐতিহ্য অনুযায়ী ‘রাঘবের ঝালি’-তে থাকে দীর্ঘদিন ভালো থাকে এমন নানা ধরনের ভোগসামগ্রী। যেমন—
বিভিন্ন ধরনের নাড়ু
মোয়া
কাসুন্দি
নানা রকম আচার
আমসত্ত্ব
শুকনো খাদ্যদ্রব্য
বিশেষ মশলা ও অন্যান্য সংরক্ষণযোগ্য ভোগ
এই সমস্ত খাদ্যসামগ্রী বিশেষ যত্নে প্রস্তুত করা হয়, যাতে দীর্ঘ যাত্রাপথেও সেগুলি নষ্ট না হয়।
শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতেও রয়েছে উল্লেখ
গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-এও ‘রাঘবের ঝালি’-র উল্লেখ রয়েছে। মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের পর একসময় এই প্রথা বন্ধ হয়ে গেলেও পরে বরানগরের পাঠবাড়ির উদ্যোগে ঐতিহ্যটি পুনরুজ্জীবিত হয়।বর্তমানে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের ভক্তদের পাঠানো ভোগসামগ্রী প্রথমে বরানগর পাঠবাড়িতে একত্রিত করা হয়। সেখান থেকে তা পুরীর উদ্দেশে পাঠানো হয়।
পানিহাটির রাঘব ভবন থেকেও সরাসরি যাচ্ছে ঝালি
গত কয়েক বছর ধরে আবার পানিহাটির ঐতিহাসিক রাঘব ভবন থেকেও সরাসরি ‘রাঘবের ঝালি’ পুরীতে নিয়ে যাওয়ার প্রথা শুরু হয়েছে। এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ঝালি প্রস্তুত করা হয়েছে।উদ্যোক্তাদের জানানো হয়েছে, ঝালির একাংশ প্রথমে বরানগর পাঠবাড়িতে পৌঁছবে। পরে অন্যান্য ভোগসামগ্রীর সঙ্গে তা পুরীতে পাঠানো হবে। পাশাপাশি অপর অংশ ভক্তরা সরাসরি পানিহাটি থেকে শ্রীক্ষেত্র পুরীতে নিয়ে যাবেন।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে যাত্রাপথ, বদলায়নি ভক্তি
পরিবহণ ব্যবস্থা ও যাত্রাপথের পরিবর্তন হলেও ‘রাঘবের ঝালি’-র মূল ঐতিহ্য আজও অপরিবর্তিত। প্রতি বছর রথযাত্রা ঘিরে পানিহাটির রাঘব ভবনে শুরু হয় ভোগ তৈরির বিশেষ প্রস্তুতি। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই ঝালি শুধু।
আজও গর্বের ঐতিহ্য পানিহাটির মানুষের
স্থানীয় ইতিহাস গবেষকদের মতে, পাঁচশো বছরের এই প্রথা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাংলার বৈষ্ণব সংস্কৃতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার। তাই প্রতি বছর রথযাত্রার আগে পানিহাটির মানুষ গভীর নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘রাঘবের ঝালি’ প্রস্তুত করেন এবং তা পুরীর উদ্দেশে পাঠান।
রথযাত্রা উপলক্ষে পাঁচশো বছরের ঐতিহ্য মেনে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি থেকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে পাঠানো হচ্ছে ‘রাঘবের ঝালি’। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রিয় পার্ষদ রাঘব পণ্ডিতের স্মৃতিবিজড়িত এই ঝালিতে থাকে নানা ধরনের দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য ভোগ—নাড়ু, মোয়া, কাসুন্দি, আচার, আমসত্ত্ব-সহ একাধিক খাদ্যসামগ্রী। আজও একই ভক্তিভরে এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন ভক্তরা।











