রথযাত্রার আগে জগন্নাথদেবের ‘বিশেষ ওষধি’! ১০ শিকড়, লবঙ্গ, দেশি ঘি, মধু-খোয়া মিশিয়ে তৈরি ‘দশমূল মোদক’, জানুন শতাব্দীপ্রাচীন রীতি

রথযাত্রার আগে স্নানযাত্রার পর কেন জগন্নাথদেবকে ‘দশমূল মোদক’ দেওয়া হয়? ১০ ভেষজ শিকড়, লবঙ্গ, ঘি, মধু-সহ বিশেষ আয়ুর্বেদিক ওষধি তৈরির প্রাচীন রীতি ও তার ধর্মীয় গুরুত্ব জানুন।

পুরীর জগন্নাথধামে রথযাত্রা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য, আচার এবং বিশ্বাসের এক অনন্য সমন্বয়। রথে আরোহনের আগে স্নানযাত্রার পর দেবতাদের ‘অসুস্থ’ হওয়া এবং তাঁদের সুস্থ করে তোলার জন্য বিশেষ আয়ুর্বেদিক ওষধি প্রয়োগের রীতি আজও সমানভাবে পালিত হয়। সেই প্রাচীন আচারগুলির অন্যতম হল ‘দশমূল মোদক’, যা রথযাত্রার প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্নানযাত্রার পর কেন ‘অসুস্থ’ হন জগন্নাথদেব?

প্রতি বছর স্নানপূর্ণিমার দিন জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাকে ১০৮ কলস সুগন্ধি পবিত্র জল দিয়ে মহাসমারোহে স্নান করানো হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ স্নানের পর দেবতারা জ্বরে আক্রান্ত হন। এরপর তাঁরা ‘অনসর গৃহ’-এ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশ্রামে থাকেন। এই সময়ে ভক্তরা তাঁদের দর্শনও পান না।

আরোগ্যের জন্য প্রথমে ‘ফুলুরি’ তেল, তারপর ‘দশমূল মোদক’

অনসর পর্বে দেবতাদের দ্রুত আরোগ্যের উদ্দেশ্যে প্রথমে ‘ফুলুরি’ নামে একটি বিশেষ আয়ুর্বেদিক তেল ব্যবহার করা হয়। এরপর রাজ-চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে প্রস্তুত করা হয় ‘দশমূল মোদক’—একটি ঐতিহ্যবাহী আয়ুর্বেদিক ওষধি, যা শ্রীমন্দিরের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ভাণ্ডার বিভাগে পৌঁছে দেওয়া হয়।

কীভাবে তৈরি হয় ‘দশমূল মোদক’?

এই বিশেষ আয়ুর্বেদিক প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয় ১০ ধরনের ভেষজ শিকড়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

শালপর্ণী

বেল

খানিবাধু

পাটালি

অঙ্কারন্তি

গোক্ষুর

লম্বাগোটি

গম্ভারী

ফণফণা

কৃষ্ণপর্ণী

এই ভেষজগুলির সঙ্গে লবঙ্গ, দেশি ঘি, মধু, মিছরি, খোয়া-সহ আরও কিছু উপাদান নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মিশিয়ে তৈরি করা হয় ‘দশমূল মোদক’।

কবে গ্রহণ করেন এই বিশেষ ওষধি?

মন্দিরের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, একাদশীর দিনে মহাপ্রভুকে এই আয়ুর্বেদিক ওষধি নিবেদন করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এর পরেই দেবতারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং ‘চাকা বিজে’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরায় স্বাভাবিক পূজা-পার্বণ শুরু হয়।অনসর চলাকালীন যেসব আচার সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে—যেমন ঘণ্টাধ্বনি বা তুলসী নিবেদন—সেগুলিও এই পর্বের পর পুনরায় শুরু হয়।

রথযাত্রার চূড়ান্ত প্রস্তুতির সূচনা

একাদশীর পর দেবতাদের আরোগ্যের সংবাদ গজপতি মহারাজকে জানানো হয়। এরপর শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত রথযাত্রার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। লক্ষ লক্ষ ভক্তের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা রথে চড়ে শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

রথযাত্রার আগে স্নানযাত্রার পর জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার ‘অনসর’ পর্বে চলে বিশেষ সেবাপদ্ধতি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ১০৮ কলস পবিত্র জলে স্নানের পর দেবতারা অসুস্থ হন। তাঁদের আরোগ্যের জন্য প্রস্তুত করা হয় ‘দশমূল মোদক’ নামে বিশেষ আয়ুর্বেদিক ওষধি। জেনে নিন এই প্রাচীন রীতির তাৎপর্য।

Leave a comment