সান ফ্রান্সিসকোতে ২৮ বছরের দুর্গাপুজো, নেই কোনও চাঁদা! ‘আলোর মন্দির’ থিমে জামদানির ছোঁয়া, ভোগে থাকছে খিচুড়ি-লাবড়া

সান ফ্রান্সিসকোর ‘সংস্কৃতি’ ১৯৯৮ সাল থেকে চাঁদা ছাড়াই দুর্গাপুজোর আয়োজন করছে। ২০২৬ সালের থিম ‘আলোর মন্দির’, থাকছে জামদানির নকশা, খিচুড়ি-লাবড়ার ভোগ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকলেও বাঙালির হৃদয়ে দুর্গাপুজোর আনন্দ একটুও ম্লান হয় না। তারই উজ্জ্বল উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর ‘সংস্কৃতি’ দুর্গাপুজো। টানা ২৮ বছর ধরে এই সংগঠন নিষ্ঠার সঙ্গে পুজোর আয়োজন করে চলেছে। কোনও সদস্যের কাছ থেকে চাঁদা না নিয়েও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিত উদ্যোগে তৈরি হয় পুজোমণ্ডপ, চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং একসঙ্গে বসে ভোগ খাওয়ার পর্ব। এ বছর ‘আলোর মন্দির’ থিমে পুজোয় থাকছে বাঙালিয়ানার সঙ্গে শিল্পের অভিনব মেলবন্ধন।

২৮ বছরের ঐতিহ্য, চাঁদা ছাড়াই দুর্গাপুজো

বিদেশে বসবাস করলেও বাঙালির উৎসবের শিকড় যে কতটা গভীরে, তা বুঝিয়ে দেয় সান ফ্রান্সিসকোর ‘সংস্কৃতি’। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া এই সংগঠনের দুর্গাপুজো আজ প্রবাসী বাঙালিদের মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সংগঠনের সদস্যরা কেউই চাঁদা দেন না। বরং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিজেদের সময়, শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে পুজোর যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করেন।

শুধু দুর্গাপুজো নয়, সারা বছর ধরেই নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকে ‘সংস্কৃতি’। সরস্বতী পুজো, নাট্যমেলা-সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলে।

২০২৬ সালের থিম ‘আলোর মন্দির’, থাকছে জামদানির নকশা

এ বছরের পুজোয় দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ ‘আলোর মন্দির’ থিম। আলোর প্রতিটি রশ্মিকে আশা ও শান্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার ভাবনা থেকেই এই মণ্ডপ পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী জামদানি বস্ত্রের নকশাকে স্টেইনড গ্লাসের মাধ্যমে নতুন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই থিমের প্রস্তুতি অবশ্য পুজোর ঠিক আগে শুরু হয় না। বসন্তকালে বাসন্তী পুজোর সময় থেকেই স্বেচ্ছাসেবকেরা শারদোৎসবের প্রস্তুতিতে নেমে পড়েন। মণ্ডপের নকশা থেকে শুরু করে সাজসজ্জা—সব কিছু নিখুঁতভাবে তৈরি করতে প্রায় ছয় মাস ধরে চলে তাঁদের নিরলস পরিশ্রম।

খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুন ভাজা—ভোগে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া

দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির কাছে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা, আড্ডা আর ভোগের স্বাদ। ‘সংস্কৃতি’র পুজোতেও তার ব্যতিক্রম নেই। নিয়ম মেনে পুজোর আচার পালনের পাশাপাশি একসঙ্গে বসে ভোগ খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে।

সংগঠনের কর্মকর্তা দেবাশীষ বসুর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষ পুষ্পাঞ্জলিতে অংশ নেন। পুজোর দু’দিনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে মায়ের ভোগ খান। সেই মেনুতে থাকে খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুন ভাজা, আলু ভাজা, চাটনি, পাপড় ও মিষ্টি। প্রবাসের মাটিতে এই পরিচিত খাবারগুলিই যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য ফিরিয়ে আনে বাংলার পুজোর স্বাদ।

যীশু সেনগুপ্তের অনুষ্ঠান, সঙ্গে আনন্দমেলার আবহ

এ বছরের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও বিশেষ আকর্ষণ। কলকাতা থেকে অভিনেতা যীশু সেনগুপ্ত ও তাঁর দল গান পরিবেশন করতে আসছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পুজো উপলক্ষে বসবে একাধিক স্টল। সেখানে মিলবে দেশের নানা সামগ্রী, খাবার ও পুজোর বই।

ফলে মণ্ডপ ঘিরে তৈরি হয় এক আনন্দমেলার পরিবেশ। প্রবাসে থেকেও পুজোর কেনাকাটা, পরিচিত খাবার আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলার উৎসবকে কাছে পাওয়ার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা।

তিন দিনে প্রায় ৭ হাজার মানুষের সমাগম

‘সংস্কৃতি’র দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, প্রবাসী বাঙালিদের সামাজিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষও। বহুদিন পর পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, কলেজজীবনের স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া কিংবা নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া—সব কিছুরই সাক্ষী এই মণ্ডপ।

দেবাশীষ বসুর কথায়, অনেকেই অল্প সময়ের জন্য আসার পরিকল্পনা করেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা মণ্ডপে কাটিয়ে দেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন দিনে প্রায় ৭ হাজার মানুষের সমাগম হয় এবং ৩৫টিরও বেশি দোকান বসে। খাবার, দেশীয় পণ্য ও বইয়ের সম্ভারে মণ্ডপ হয়ে ওঠে প্রবাসে বাংলার এক টুকরো প্রতিচ্ছবি।

বিদেশের মাটিতে থেকেও বাঙালির ঐতিহ্য ও দুর্গাপুজোর আবেগকে অটুট রেখেছে সান ফ্রান্সিসকোর বাঙালি সংগঠন ‘সংস্কৃতি’। ১৯৯৮ সাল থেকে চলে আসা এই পুজোর বিশেষত্ব, সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে কোনও চাঁদা নেওয়া হয় না। স্বেচ্ছাসেবকদের পরিশ্রমেই আয়োজিত হয় পুজো ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ২০২৬ সালে পুজোর থিম ‘আলোর মন্দির’। ঐতিহ্যবাহী জামদানি নকশাকে স্টেইনড গ্লাসের মাধ্যমে নতুনভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা যেমন রয়েছে, তেমনই থাকছে বাঙালির চিরপরিচিত খিচুড়ি-লাবড়ার ভোগ।

Leave a comment