প্রেম আর কমেডির ভিড়ে ১৯৯৮-এ জায়গা হয়নি ‘সত্য’-র। প্রথম সপ্তাহে একেবারেই দর্শক আসেনি, নির্মাতারা ভেবেছিলেন ছবিটি ডুবে যাবে। কিন্তু হঠাৎই শুরু হয় উল্টো স্রোত—মুম্বই আন্ডারওয়ার্ল্ডের নির্মম বাস্তবতা আর ভিখু মহাত্রে চরিত্রের দুর্দান্ত উপস্থাপনায় ‘সত্য’ পরিণত হয় কাল্ট ছবিতে। একইসঙ্গে বলিউডে নতুন দরজা খুলে যায় মনোজ বাজপেয়ীর জন্য।
রোমান্স-কমেডির বাজারে খাপে খায়নি ‘সত্য’
১৯৯৮ সালে বলিউডে রাজ করছিল প্রেমের গল্প। ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘পেয়ার তো হোনা হি থা’, ‘সোলজার’, ‘বড়ে মিয়াঁ ছোটে মিয়াঁ’—বক্স অফিস এককথায় রোমান্টিক-কমেডির দখলে। সেই বাজারে হঠাৎই আসে রাম গোপাল ভার্মার আন্ডারওয়ার্ল্ড-ভিত্তিক ছবি ‘সত্য’। মুক্তির প্রথম সপ্তাহে দর্শকের অনুপস্থিতি দেখে নির্মাতারা ধরেই নিয়েছিলেন ছবিটি ফ্লপ হবে। কিন্তু প্রথম সপ্তাহ পেরুতে না পেরুতেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
হঠাৎই দর্শকের ঢল, এক সপ্তাহে বদল ছবির ভাগ্য
৩ জুলাই মুক্তির এক সপ্তাহ পরে ছবিটি যেন নতুন জীবন পায়। কথার প্রচার শুরু হয়—বাস্তব আন্ডারওয়ার্ল্ডের এমন নির্মম চিত্র বলিউডে আগে কেউ দেখায়নি। দর্শকের ভিড় বাড়তে থাকে, হল ভর্তি হতে শুরু করে। ‘সত্য’ বুঝিয়ে দেয়, কনটেন্ট শক্তিশালী হলে প্রচলিত ধারাকে ভেঙেও জায়গা করে নেওয়া যায়।
‘দ্য গডফাদার’-এর ছোঁয়া, মুম্বইয়ের গলির বাস্তবতা
ছবির প্লট আংশিক অনুপ্রাণিত ১৯৭২ সালের কালজয়ী ‘দ্য গডফাদার’ থেকে। তবে ‘সত্য’-র কাহিনি, পরিবেশ এবং চরিত্রায়ন পুরোপুরি মুম্বই আন্ডারওয়ার্ল্ডের রূঢ় বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে। সিনেম্যাটোগ্রাফি, লোকেশন, লাল-ধূসর আলোর ছায়া—সব মিলিয়ে দর্শকের মনে হয়েছিল, তারা সত্যিই অপরাধজগতের গলিগুলোয় হাঁটছে। বাস্তব আর সিনেমার ব্যবধান মুছে গিয়েছিল।
ভিখু মহাত্রে: মনোজ বাজপেয়ীর জীবনের মোড় ঘোরানো চরিত্র
এই ছবির মেরুদণ্ড নিঃসন্দেহে ভিখু মহাত্রে। মনোজ বাজপেয়ীর অভিনীত এই চরিত্র বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী গ্যাংস্টার চরিত্র হিসেবে মান্যতা পায়। ‘‘মুম্বই কা কিং কৌন? ভিখু মহাত্রে!’’—এই সংলাপ আজও দর্শকদের মুখে মুখে ফেরে। মনোজ পরে জানিয়েছেন, তিনি বেত্তিয়ার এক কুখ্যাত অপরাধীর আচরণ, পোশাক, ব্যক্তিত্ব থেকে চরিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন। এই ছবিই তাঁকে রাতারাতি তারকা করে তোলে।
নতুনদের হাতে জন্ম নেয় কাল্ট ছবি
সত্যর বেশিরভাগ অভিনেতাই ছিলেন নতুন মুখ। মনোজ বাজপেয়ী, জে ডি চক্রবর্তী, সৌরভ শুক্লা, গোবিন্দ নামদেব, সুশান্ত সিং—প্রত্যেকেই নিজেদের সেরাটা দিয়েছেন। রাম গোপাল ভার্মা, অনুরাগ কাশ্যপ এবং সৌরভ শুক্লার যৌথ মেধায় তৈরি হয় স্ক্রিপ্ট, যা পরবর্তীতে বলিউডে বাস্তববাদী সিনেমার নতুন যুগের সূচনা করে। বাস্তবতার এই ধারাই পরবর্তী সময়ে অনুরাগ কাশ্যপকে তাঁর নিজস্ব ঘরানা গঠনে সাহায্য করে।
‘সপনে মে মিলতি হ্যায়’: সংগীতেও ছিল নতুনত্ব
বিশাল ভরদ্বাজের সুরে তৈরি গান ‘সপনে মে মিলতি হ্যায়’ আজও জনপ্রিয়। ছবির গাঢ়, রূঢ় পরিবেশের সঙ্গে এই সুর বাস্তবতার মাঝে এক স্থিরতা আর রোমান্টিক ছোঁয়া এনে দেয়। গানটিও ছবির কাল্ট মর্যাদা পাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
মনোজ–অনুরাগ–আরজিভি: বন্ধুত্ব, তর্ক ও সৃষ্টির ইতিহাস
এক ককটেল পার্টিতে অনুরাগ কাশ্যপ রাম গোপাল ভার্মার একটি সিনেমাকে কড়া সমালোচনা করেছিলেন। ব্যাপারটি দেখে মনোজ বাজপেয়ী অবাক হলেও আরজিভি সেই নির্ভিক সমালোচনাকে পছন্দ করেন। এখান থেকেই শুরু হয় অনুরাগ এবং আরজিভির বন্ধুত্ব, যা পরে ‘সত্য’-র গল্প নির্মাণে বড় ভূমিকা নেয়। গল্প লেখায় যখন অনুরাগ সমস্যায় পড়েন, সৌরভ শুক্লাকে যুক্ত করেন। আরজিভি সৌরভকে ‘কাল্লু মামা’ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগও দেন।
বলিউডে বাস্তবধর্মী ক্রাইম সিনেমার জন্মদাতাদের একটি
‘সত্য’ শুধু একটি ছবি নয়—এটি বলিউডে রিয়ালিস্টিক ক্রাইম সিনেমার ভিত্তি স্থাপন করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ছবি চলচ্চিত্র-শিক্ষার্থী, নির্মাতা এবং সমালোচকদের কাছে এক অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
১৯৯৮ সালে মুক্তির পর সপ্তাহভর দর্শকশূন্য! তবুও কনটেন্টের জোরে পরে কাল্ট মর্যাদা পায় রাম গোপাল ভার্মার ‘সত্য’। আন্ডারওয়ার্ল্ড-বাস্তবতার ছাপ আর ভিখু মহাত্রে চরিত্র মনোজ বাজপেয়ীর অভিনয়—এই ছবি বদলে দিয়েছিল বলিউডের ধারা ও অভিনেতার কেরিয়ার।













