যুক্তরাষ্ট্রের দোহা বৈঠকের দাবি নাকচ করে প্রযুক্তিগত আলোচনার কথা জানাল ইরান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য বৈঠকের দাবি করলেও ইরান জানিয়েছে, কোনো রাজনৈতিক আলোচনা নির্ধারিত হয়নি। ইরানের মতে, কেবল প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল দোহায় আলোচনা করবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে আবারও কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump দাবি করেছেন, মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী Doha-এ দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই বৈঠকের অনুরোধ ইরানের পক্ষ থেকেই করা হয়েছে এবং এর উদ্দেশ্য ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারক (MoU)-এর অগ্রগতি এগিয়ে নেওয়া। তবে ইরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো পর্যায়েই রাজনৈতিক আলোচনা নির্ধারিত হয়নি। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরান যাতে কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দোহায় সম্ভাব্য বৈঠক সেই লক্ষ্য পূরণের দিকেই একটি পদক্ষেপ হতে পারে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত Steve Witkoff কাতারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। তবে এই আলোচনা কতটা সফল হবে, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ট্রাম্পের ভাষায়, বৈঠকটি "গুরুত্বপূর্ণও হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।"

ট্রাম্পের বক্তব্যের কিছুক্ষণ পরই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো নতুন রাজনৈতিক আলোচনার সূচি নির্ধারিত হয়নি। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, দোহায় শুধুমাত্র একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে, যারা প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে। ইরানের দাবি, এই প্রতিনিধি দল সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়নসংক্রান্ত ব্যবহারিক বিষয় নিয়ে কাজ করবে এবং এর উদ্দেশ্য রাজনৈতিক আলোচনা নয়।

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু হবে তখনই, যখন পূর্বনির্ধারিত শর্তগুলো বাস্তবায়িত হবে। ইরানের মতে, সব সামরিক ফ্রন্টে সংঘাতের অবসান ঘটাতে হবে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে, অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম কমাতে হবে এবং Strait of Hormuz সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে খুলে দিতে হবে। পাশাপাশি, ইরানি তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কাতারসহ অন্যান্য দেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দোহা বৈঠকের দাবি নাকচ করে প্রযুক্তিগত আলোচনার কথা জানাল ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রভাব হরমুজ প্রণালিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই পথ দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি বাজারও এই পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে।

এদিকে, ইরান ও Oman মাসকাটে যৌথ হরমুজ কমিটির প্রথম বৈঠক করেছে। বৈঠকে প্রণালির নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে, তাই এই বৈঠক ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, কাতারে আটকে থাকা তাদের কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদের একটি বড় অংশ শিগগিরই মুক্ত হতে পারে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, মোট ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার দ্রুত ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরানের মতে, দোহার প্রযুক্তিগত আলোচনায় এই বিষয়টিও অন্যতম প্রধান এজেন্ডা থাকবে এবং উভয় পক্ষ পরবর্তী প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব বিভিন্ন দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যেও পড়েছে। Lee Jae-myung জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে সামুদ্রিক বাণিজ্য নিরাপদ রাখতে কাজ করছে।

বিদেশনীতি ছাড়াও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজার নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি পেট্রোল পাম্প পরিচালনাকারী ও জ্বালানি বিক্রেতাদের উদ্দেশে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে যাওয়ার পরও ভোক্তাদের কাছ থেকে উচ্চমূল্য নেওয়া সমীচীন নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, খুচরা জ্বালানির দাম দ্রুত কমানো না হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

দোহায় প্রস্তাবিত বৈঠক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এটি কূটনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। অন্যদিকে, তেহরানের বক্তব্য, আপাতত শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত পর্যায়ের আলোচনা হবে।

 

Leave a comment