ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে টাইফুন বাভির প্রভাবে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে একাধিক ভূমিধসের ঘটনায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, আরও কয়েকজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। একই সময়ে তাইওয়ান, চীন ও জাপানে ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসের সতর্কতা জারির পর প্রশাসন ব্যাপক নিরাপত্তা ও ত্রাণ প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিন্দানাও দ্বীপ, যেখানে রাতের সময় সংঘটিত ভূমিধসে বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষের সন্ধানে ধারাবাহিকভাবে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, টাইফুন বাভির বিস্তৃতি প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার, যা এটিকে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের বৃহত্তম ও শক্তিশালী ঝড়গুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করে এটি তাইওয়ান, জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দ্বীপপুঞ্জ এবং পরে দক্ষিণ-পূর্ব চীনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শনিবার এটি চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানতে পারে।
তাইওয়ানের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, টাইফুনের প্রভাবে দেশটির উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে এক মিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। সম্ভাব্য বন্যা, ভূমিধস ও প্রবল বাতাসের আশঙ্কায় প্রশাসন প্রায় ২৯,০০০ সেনাসদস্যকে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের জন্য প্রস্তুত রেখেছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, আকারের দিক থেকে এটি ১৯৮৭ সালের পর তাইওয়ানের দিকে অগ্রসর হওয়া সবচেয়ে বড় টাইফুন হতে পারে।
চীনও টাইফুন বাভিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সতর্কতা জারি করেছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝড়ের প্রধান প্রভাব দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ফুজিয়ান প্রদেশে পড়তে পারে, তবে এর অবশিষ্টাংশ উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। জিয়াংসু, আনহুই এবং বোহাই সাগর অঞ্চলেও ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসের প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। উত্তর চীনের অনেক এলাকায় টাইফুনের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
![]()
জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাকিশিমা দ্বীপপুঞ্জেও প্রশাসন বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রবল বাতাসের ক্ষতি এড়াতে বাড়ি ও দোকানের জানালা মজবুত করেছেন এবং সুরক্ষা জাল স্থাপন করেছেন। সম্ভাব্য ঝড়ের কারণে বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল সক্রিয় করেছে। টাইফুন বাভির আশঙ্কায় পুরো অঞ্চলে পরিবহন পরিষেবা প্রভাবিত হয়েছে।
তাইওয়ান, চীন ও জাপানের বিভিন্ন শহরে সম্ভাব্য দুর্যোগের আশঙ্কায় মানুষ খাদ্যসামগ্রী, পানীয় জল, ওষুধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে মজুত করছেন। বহু সুপারমার্কেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে কৃষকেরা প্রতিকূল আবহাওয়া শুরুর আগে ফসল কাটার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করছেন এবং জেলেরা তাদের নৌকা নিরাপদ স্থানে বেঁধে রাখছেন।
পূর্ব এশিয়া সম্প্রতি টাইফুন মেইসাকের ক্ষয়ক্ষতি থেকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। ওই টাইফুনে অন্তত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং ১.৩ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কৃষিখাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল এবং বহু এলাকায় বন্যা ও প্রবল বাতাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এ কারণে প্রশাসন এবার আগেভাগেই বাড়তি সতর্কতা গ্রহণ করেছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিবর্তিত জলবায়ুগত পরিস্থিতির কারণে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও টাইফুনের তীব্রতা বাড়ছে। তাদের মতে, সময়মতো সতর্কতা, কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ফিলিপাইনে উদ্ধারকারী দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আটকে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে তাইওয়ান, চীন ও জাপানে জরুরি পরিষেবা, সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনকে পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে দ্রুত ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা যায়।









