যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের পাল্টা আঘাতের দাবি, হরমুজ প্রণালী ইস্যুতে বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা, ইরানের পাল্টা আক্রমণের দাবি, হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সতর্কতার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেলবাজার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দুই দেশের মধ্যে বিমান হামলা ও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে একাধিক উপসাগরীয় দেশে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় বিমান হামলা চালানোর পর ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কুয়েত, বাহরাইন এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতি থাকা অন্যান্য এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, যা ইরান বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ভোরে মার্কিন বাহিনী ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এসব হামলায় টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে।

ইরানের কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, মিনাব এবং সিরিকসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার পর বিভিন্ন অঞ্চলে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump দাবি করেছেন, ইরান পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বিলম্ব করছিল, যার ফলে এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মতে, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, নজরদারি নেটওয়ার্ক এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল করা।

মার্কিন হামলার পরপরই ইরান পাল্টা হামলার দাবি করে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

এছাড়া ইরান দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটির দিকে ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলায় মার্কিন যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়। তবে জর্ডানের সেনাবাহিনী এ দাবির আংশিক বিরোধিতা করে জানিয়েছে, বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই প্রতিহত করা হয়েছে এবং বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের পাল্টা আঘাতের দাবি, হরমুজ প্রণালী ইস্যুতে বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা

এই সংঘাতের প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই ক্রুড উভয়ের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের বড় অংশ পরিবাহিত হয়।

তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথগুলো খোলা রয়েছে এবং সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

উত্তেজনার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিও কঠোর হয়েছে। বাহরাইনে একাধিকবার এয়ার রেইড সাইরেন বাজানো হয়েছে এবং নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কুয়েতও জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার তথ্য পাওয়া গেছে, যার পর নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে তারা ধারাবাহিকভাবে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

স্থানীয় প্রশাসন নাগরিকদের গুজবে কান না দিয়ে শুধুমাত্র সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছে।

জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমার দিকে অগ্রসর হওয়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, ধ্বংসাবশেষ কিছু এলাকায় পড়লেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ইরান দাবি করেছিল যে তারা জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, তবে জর্ডান সেই দাবি পুরোপুরি স্বীকার করেনি।

ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে রাশিয়া উভয় দেশকে সংযম প্রদর্শন এবং সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করে কূটনৈতিক পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে কাতার একটি প্রতিনিধিদল ইরানে পাঠিয়েছে। এর উদ্দেশ্য আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠা করা বলে জানানো হয়েছে।

ওমান উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও সামনে এসেছে। জাহাজটিতে বিভিন্ন দেশের নাবিক ছিলেন, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন বলে জানানো হয়েছে। ঘটনায় একজনের মৃত্যুর এবং কয়েকজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ঘটনা সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ রুটের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক দাবি করে চলেছে। ইরান ১৮টি মার্কিন স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবিও সামনে এসেছে, তবে সেগুলোর স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

 

Leave a comment