যুক্তরাষ্ট্র টানা ১২তম রাতেও ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)-এর তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ কেন্দ্র, ড্রোন স্থাপনা, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরব-সংশ্লিষ্ট দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
CENTCOM জানিয়েছে, টানা ১২তম রাতেও ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নির্ভুল বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, ড্রোন নেটওয়ার্ক, সামুদ্রিক সামরিক সম্পদ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করা। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, চলতি মাসে ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র তার সামুদ্রিক নজরদারি ও নিরাপত্তা কার্যক্রমও বৃদ্ধি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের ফলে ইরানের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশটি “যথেষ্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে।” তবে তিনি বলেন, তেহরান বর্তমানে কোনো সমঝোতার জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে না। ট্রাম্প আরও সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কৌশলগত অবকাঠামোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, খুজেস্তান, বুশেহর, হরমোজগান এবং ইলাম প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি এলাকায় সামরিক স্থাপনা ও নিরাপত্তা ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইরান-ইরাক সীমান্তসংলগ্ন শালমচেহ সীমান্ত ক্রসিং এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, সেখানে দুইজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন চলমান রয়েছে। এছাড়া বুশেহর প্রদেশ এবং আন্দিমেশক এলাকাতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণের পর আগুন লেগেছে। সংগঠনটি আরও দাবি করেছে যে, ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক কার্যক্রমের ওপর তাদের কড়া নজরদারি রয়েছে। তবে এই দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ সম্ভব হয়নি। হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এ অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতার প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলবাজারে দ্রুত প্রতিফলিত হয়।
![]()
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরব-সংশ্লিষ্ট দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা UKMTO-ও সৌদি উপকূলের কাছে একটি জাহাজে হামলার তথ্য প্রকাশ করেছে। হুতি গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে সৌদি বন্দর থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তাও দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে পরিচালিত বৈশ্বিক বাণিজ্য ও তেল সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান সংঘাতের মধ্যে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ৯৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাব অল্প ব্যবধানে অনুমোদন করেছে। প্রস্তাবটি এখন সিনেটে বিবেচনার জন্য যাবে। এতে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অন্যান্য কৌশলগত প্রয়োজনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার খাতে বেশি ব্যয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার সামরিক ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলার অতিক্রম করেছে এবং WTI ক্রুড ৮৫ ডলার প্রতি ব্যারেলের ওপরে লেনদেন হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বা লোহিত সাগরে উত্তেজনা আরও বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর বিস্তৃত প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান-সমর্থিত সম্ভাব্য সাইবার হামলার আশঙ্কায় মার্কিন সংস্থাগুলো সতর্কতা জারি করেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি কোম্পানি এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল নেটওয়ার্ককে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সংঘাত শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সাইবার হামলা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলও এ ধরনের সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। একই সময়ে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতায় লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও অস্থিরতা বেড়েছে। উভয় ক্ষেত্রে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।









