হরমুজ প্রণালীর কাছে মার্কিন সামরিক অভিযান ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি

হরমুজ প্রণালীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ, ইরানের প্রতিক্রিয়া, চলমান যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনা, কাতারের মধ্যস্থতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।

হরমুজ প্রণালীর কাছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক নৌযান ও একটি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় সামরিক অভিযান চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক পদক্ষেপ নেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী এমন নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যেগুলো সমুদ্রপথে কথিতভাবে মাইন পেতে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। পাশাপাশি বন্দর আব্বাস বন্দরের কাছে অবস্থিত একটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এই পদক্ষেপকে “আত্মরক্ষা” হিসেবে বর্ণনা করেছে। মুখপাত্র টিমোথি হকিন্স বলেন, মার্কিন সেনা ও যুদ্ধজাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক রুট এবং মার্কিন নৌযানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। তাদের মতে, এই এলাকায় মাইন পেতে দেওয়া হলে তা শুধু সামরিক জাহাজ নয়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যুদ্ধবিরতির পরিবেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সংযম বজায় রাখছে এবং পরিস্থিতিকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এই সামরিক অভিযানের মধ্যে দুই দেশের চলমান কূটনৈতিক আলোচনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা আলোচনার প্রক্রিয়ায় সাময়িক বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তবে বর্তমানে শান্তি প্রচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। কাতারে অনুষ্ঠিত বৈঠকে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর হয়নি।

মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে আবারও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কোনো “দুর্বল বা ওবামা-স্টাইল চুক্তি” গ্রহণ করবে না। ট্রাম্প বলেন, হয় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শক্তিশালী চুক্তি হবে, নয়তো কোনো চুক্তিই হবে না।

হরমুজ প্রণালীর কাছে মার্কিন সামরিক অভিযান ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি

ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ধ্বংস করা হবে অথবা যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে নিষ্ক্রিয় করা হবে।

ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা কোনো পরিস্থিতিতেই নিজেদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়তে প্রস্তুত নয়। ইরানি নেতৃত্বের বক্তব্য, পারমাণবিক প্রযুক্তি তাদের সার্বভৌম অধিকার এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তা প্রয়োজনীয়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত শর্তের কারণে চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ওপর যত চাপই প্রয়োগ করা হোক, তারা সম্পূর্ণভাবে পিছু হটতে প্রস্তুত নয়। সাবেক মার্কিন কূটনীতিকদের মতে, কৌশলগত ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে ইরান কোনো সমঝোতায় যাবে না।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা আলোচনাকে পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে আলোচনার শর্তে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে “চাপ প্রয়োগের কৌশল” হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে কাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। সম্প্রতি ইরানকে চুক্তির জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রস্তাব করা হয়েছে বলে যে গুঞ্জন ছড়ায়, তা কাতার সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরনের খবর ভুল এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রচেষ্টাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে তা ছড়ানো হচ্ছে।

তেহরান প্রশাসনের মতে, সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ ভবনের মেরামত প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৯০ শতাংশের বেশি হালকা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট কাজ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হবে।

এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর একাধিক অবস্থানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক ডজন অস্ত্র সংরক্ষণাগার ও কমান্ড পোস্টকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

ইসরায়েলের দাবি, নিরাপত্তাজনিত কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, লেবাননে এসব হামলায় একাধিক বেসামরিক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

 

Leave a comment