নিউইয়র্ক টাইমসের দাবি এপ্রিলের পারমাণবিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল

নিউন পারমাণবিক আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে ইরানকে সতর্ক করেছিল। প্রতিবেদনে আঞ্চলিক কূটনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জাতিসংঘে ইরানের অভিযোগ এবং চলমান পারমাণবিক আলোচনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল যে আলোচনায় অংশ নেওয়া ইরানি প্রতিনিধিদের ইসরায়েল লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। সেই আশঙ্কার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদার দেশগুলোর মাধ্যমে তেহরানকে সতর্ক থাকার বার্তা পাঠায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের বিশেষ উদ্বেগ ছিল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের নিরাপত্তা নিয়ে। তবে এই দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা অব্যাহত রাখা। আলোচনায় অংশ নেওয়া শীর্ষ ইরানি নেতাদের ওপর হামলা হলে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য-সংক্রান্ত সংলাপ সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হতে পারত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমানো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়া ঠেকানো। এ কারণে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের সময় ইরানি প্রতিনিধিদলের ওপর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা ছিল। নিরাপত্তার কারণে পাকিস্তান ইরানি কর্মকর্তাদের বহনকারী বিমানকে যুদ্ধবিমানের নিরাপত্তা দিয়ে ইসলামাবাদ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেরার পথে নিরাপত্তা সতর্কতার কারণে বিমানটিকে ইরানের মাশহাদ শহরে জরুরি অবতরণ করতে হয়। পরে প্রতিনিধিদল সড়কপথে তেহরানে পৌঁছায়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।

দোহায় সাম্প্রতিক বৈঠকের পর কাতার ইঙ্গিত দিয়েছে যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনা সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির শেষকৃত্যের পর অনুষ্ঠিত হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্লেষকদের মতে দুই দেশের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত থাকা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে।

ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অভিযোগ দায়ের করেছে। তেহরানের অভিযোগ, ইসরায়েল ইরানি নেতৃত্বকে হুমকি দিয়েছে, যা আঞ্চলিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ইরান এ বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। অন্যদিকে, এ অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

নিউইয়র্ক টাইমসের দাবি এপ্রিলের পারমাণবিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল

সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির শেষকৃত্যের আগে পুরো ইরানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, অনুষ্ঠানে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে কয়েক কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে। এ কারণে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং নিরাপত্তা সংস্থার অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভি শেষকৃত্যে অংশ নিতে তেহরানে পৌঁছেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন। খামেনির মৃত্যুর পর পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কথিত নিরাপত্তা হুমকির পর ইরানে পারমাণবিক নীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের পারমাণবিক নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তিগুলোর পর্যালোচনা করা উচিত। তাঁর মতে, জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলে কৌশলগত নীতিতে পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ইরান সরকার এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।

খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে তাঁর কফিনের ওপর মাশহাদের ইমাম রেজা দরগাহর লাল পতাকা রাখা হয়। শিয়া ঐতিহ্যে এই পতাকা শাহাদাত, আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতীকের মাধ্যমে ইরানি নেতৃত্ব খামেনির মৃত্যুকে শাহাদাত হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। তাঁর শেষকৃত্য মাশহাদের ইমাম রেজা দরগাহ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার আহমদ ভাহিদি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে উপস্থিত হন। তিনি তেহরানে আয়োজিত শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। প্রতিবেদনে তাঁর উপস্থিতিকে নিরাপত্তা ও সামরিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে হরমুজ প্রণালি তার নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের অংশ এবং সেখানে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে সব জাহাজকে নির্ধারিত সামুদ্রিক রুট অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এছাড়া ইরান ফোর্দো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর পরিদর্শকদের প্রবেশ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কথিত নিরাপত্তা সতর্কবার্তা, পারমাণবিক আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা, জাতিসংঘে কূটনৈতিক বিরোধ এবং ইরানের পরিবর্তিত নিরাপত্তা কৌশল পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিকে সংবেদনশীল করে তুলেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগ পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

Leave a comment