শিশুর শরীরে হঠাৎ সাদা বা ফ্যাকাশে দাগ দেখা দিলে অনেক অভিভাবকই প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এমন পরিবর্তন কখনও কখনও শ্বেতী বা ভিটিলিগোর লক্ষণ হতে পারে। এই রোগ সংক্রামক নয়, প্রাণঘাতীও নয়, তবে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তন চোখে পড়লেই দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
শ্বেতী কী? কেন হয় এই রোগ?
ভিটিলিগো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগ, যেখানে ত্বকের রঙ তৈরি করা মেলানোসাইট নামের কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে শরীরের নির্দিষ্ট অংশে সাদা দাগ দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত একটি অটোইমিউন রোগ। অর্থাৎ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজেরই রঞ্জক উৎপাদনকারী কোষগুলিকে আক্রমণ করে। অনেক ক্ষেত্রে বংশগত কারণও এর পিছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে বড় লক্ষণ—ত্বকে সাদা দাগ
শিশুদের শ্বেতীর সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো ত্বকে দুধ-সাদা বা হালকা রঙের দাগ তৈরি হওয়া। এই দাগ সাধারণত মুখ, ঠোঁটের চারপাশ, চোখের আশপাশ, হাত, আঙুল, কনুই, হাঁটু, পা বা শরীরের ভাঁজে প্রথম দেখা যায়। শুরুতে ছোট দাগ থাকলেও ধীরে ধীরে তার আকার বা সংখ্যা বাড়তে পারে। অনেক সময় মাথার চুল, ভ্রু, চোখের পাপড়ি বা মাথার ত্বকের চুলও অকালেই সাদা হয়ে যেতে পারে।
ব্যথা বা চুলকানি না থাকায় অনেক সময় ধরা পড়তে দেরি হয়
ভিটিলিগোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, আক্রান্ত স্থানে সাধারণত ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা চুলকানি থাকে না। তাই অনেক পরিবার প্রথম দিকে বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও কারণ ছাড়াই ত্বকের রং পরিবর্তন হতে শুরু করলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত পরীক্ষা করালে শ্বেতী এবং অন্যান্য ত্বকের রোগের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা সহজ হয়।
শ্বেতী কি ছোঁয়াচে?
এই রোগ নিয়ে সমাজে এখনও নানা ভুল ধারণা রয়েছে। চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য, শ্বেতী কোনও সংক্রামক রোগ নয়। স্পর্শ, একসঙ্গে খাওয়া, খেলাধুলা বা একই বাড়িতে থাকার মাধ্যমে এই রোগ একজনের থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়ায় না। তাই শ্বেতীতে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা করে রাখা বা তার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সমর্থনও জরুরি
বর্তমানে ভিটিলিগোর জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাহ্যিক ওষুধ, আলোক-ভিত্তিক থেরাপি (ফোটোথেরাপি) এবং সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। তবে শুধু ওষুধ নয়, শিশুর আত্মবিশ্বাস বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের ইতিবাচক আচরণ, স্কুলের সহযোগিতা এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিং শিশুর মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে।
শ্বেতী বা ভিটিলিগো শুধু বড়দের নয়, শিশুদেরও হতে পারে। ত্বকে সাদা দাগ, চুলের রং পরিবর্তন বা দাগের আকার বাড়তে থাকলে অবহেলা নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছোঁয়াচে নয় এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।













