একদিকে নিম্নচাপ ও পশ্চিমী ঝঞ্ঝার জোড়া প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির সম্ভাবনা, অন্যদিকে মাসের শুরুতেই বড় বৃষ্টিঘাটতি। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পূর্ব ভারত থেকে উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় আগামী সাত দিনে বৃষ্টি হতে পারে। বাংলা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা থেকে দিল্লি-এনসিআর, পঞ্জাব, হরিয়ানা, জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ—একাধিক অঞ্চল থাকবে আবহাওয়ার নজরে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ৩৬ শতাংশ বৃষ্টিঘাটতি
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ৩ থেকে ৯ সেপ্টেম্বরের সময়কালে প্রত্যাশিত মাত্রার তুলনায় বৃষ্টিপাত ৩৬ শতাংশ কম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু অংশে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টি হয়েছে। এর জেরে প্রশ্ন উঠছে, মৌসুমী বায়ুর বিদায়পর্বের পাশাপাশি এল নিনোর প্রভাবও কি আবহাওয়ায় পড়তে শুরু করেছে?
এল নিনোর প্রভাব নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
আবহাওয়াবিদদের একাংশের আশঙ্কা, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব পড়লে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমতে পারে এবং গড় তাপমাত্রা বাড়তে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের উপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।তবে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় আবহাওয়া ব্যবস্থা থাকার কারণে আগামী কয়েক দিনে অনেক এলাকায় ভালো বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপে বাড়বে বৃষ্টি
দক্ষিণ ওড়িশা ও উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের কাছে নিম্নচাপটি অবস্থান করছে। এর সঙ্গে যুক্ত ঘূর্ণাবর্তটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯.৪ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।আগামী ২৪ ঘণ্টায় নিম্নচাপটি আরও ঘনীভূত হয়ে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে এগোতে পারে। এর প্রভাবে ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং মধ্য ভারতের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সক্রিয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝাও
বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের পাশাপাশি উত্তর পঞ্জাব ও সংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। একই সঙ্গে উত্তর রাজস্থান থেকে নিম্নচাপ এলাকা পর্যন্ত মৌসুমী অক্ষরেখা বিস্তৃত রয়েছে।এই একাধিক আবহাওয়া ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবে দেশের পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
দিল্লি-এনসিআর থেকে উত্তরপ্রদেশে বৃষ্টি
১১ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দিল্লি, হরিয়ানা এবং চণ্ডীগড়ে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি চলতে পারে। ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর এই অঞ্চলগুলির কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।পশ্চিম উত্তরপ্রদেশেও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ১২ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে।
বাংলা, বিহার, ওড়িশায়ও নজর আবহাওয়া দফতরের
পূর্ব ভারতের ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড এবং বিহারের বিভিন্ন এলাকায় আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি হতে পারে।১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। হিমালয় সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে ১৩ এবং ফের ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টি হতে পারে।অন্যদিকে বিহারে ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। রাজ্যের কয়েকটি এলাকা ইতিমধ্যেই বন্যার সমস্যায় থাকায় নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
উত্তরাখণ্ড, জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখেও বৃষ্টির সম্ভাবনা
উত্তরাখণ্ডে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিছু এলাকায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রবিদ্যুৎ ও বজ্রপাতের আশঙ্কা থাকছে।জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ এবং সংলগ্ন এলাকায় ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত থেকে বিস্তৃত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর সেখানে বৃষ্টি বাড়ার পাশাপাশি বজ্রপাত ও ঝড়ের আশঙ্কাও রয়েছে।

মধ্য ভারতেও বাড়বে বৃষ্টির দাপট
মধ্যপ্রদেশ, বিদর্ভ ও ছত্তিশগড়েও সক্রিয় থাকবে মৌসুমী বায়ু। ১২ সেপ্টেম্বর পূর্ব ও পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ এবং বিদর্ভের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর পশ্চিম মধ্যপ্রদেশে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ছত্তিশগড়ে ১২ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে এবং ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।বিদর্ভে ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়ার সঙ্গে বজ্রঝড়ের আশঙ্কাও রয়েছে।
রাজস্থান-পঞ্জাবেও বৃষ্টির পূর্বাভাস
১৩ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পঞ্জাবের কিছু এলাকায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। পূর্ব রাজস্থানে ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।পশ্চিম রাজস্থানেও ১২ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। ১২ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতে বজ্রপাতের ঝুঁকি
উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতেও বৃষ্টির পরিস্থিতি বজায় থাকবে। অরুণাচল প্রদেশে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।অসম ও মেঘালয়ে ১২-১৪ সেপ্টেম্বর এবং ফের ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টি হতে পারে। নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম ও ত্রিপুরাতেও বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। পাশাপাশি বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের ঝুঁকিও থাকছে।
মহারাষ্ট্র-গুজরাতেও ভারী বৃষ্টি
পশ্চিম ভারতের কোঙ্কন ও গোয়া অঞ্চলে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্য মহারাষ্ট্রে ১৩ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে এবং ১৩ সেপ্টেম্বর অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।গুজরাতেও ১২ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর কিছু এলাকায় অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
দক্ষিণ ভারতেও ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা
উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ, ইয়ানাম ও তেলেঙ্গানায় ১২ সেপ্টেম্বর ব্যাপক বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশে ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি ঝড়ো হাওয়া বইতে পারে।এ সময় বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৫০-৬০ কিলোমিটার এবং দমকা হাওয়ার ক্ষেত্রে তা ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। তামিলনাড়ু, পুদুচেরি ও কারাইকালেও বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
আবহাওয়া খারাপ থাকার সম্ভাবনায় সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীদের জন্যও সতর্কতা জারি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ওড়িশা এবং উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় সামুদ্রিক পরিস্থিতি প্রতিকূল হতে পারে।উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল ও সংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরেও ১২ সেপ্টেম্বর সামুদ্রিক কার্যকলাপ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আবহাওয়া দফতরের নির্দেশ মেনে সমুদ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আগামী সাত দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতে সক্রিয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে পূর্ব, উত্তর ও মধ্য ভারতের একাধিক রাজ্যে বৃষ্টি বাড়তে পারে। তবে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ এর পিছনে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও বলছেন।











