পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ এবং নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) নিয়ে রবিবার নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রক্রিয়া বাংলায় হবেই। কমিশনের এই বক্তব্যের পরই রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। একদিকে কমিশনের নিরপেক্ষতার দাবি, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলির অভিযোগ—সব মিলিয়ে শুরু হয়েছে প্রবল তরজা।
সরাসরি আক্রমণ চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের
নির্বাচন কমিশনের মন্তব্যকে একেবারেই মেনে নিতে নারাজ রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। কমিশনের ঘোষণার পর তিনি বলেন, “হবেই, কী করে হয় সেটাও আমরা দেখব। গণতন্ত্র যা বলবে, তাই হবে। অগণতান্ত্রিক কিছু হলে বাংলার মানুষ মেনে নেবে না।” তাঁর মতে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও দলের নেতাদের সংসদে বলা কথার পরেই কমিশন এই ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।

‘নিরপেক্ষতা কোথায়?’ প্রশ্ন মন্ত্রীর
চন্দ্রিমার অভিযোগ, কমিশনের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তিনি বলেন, “এখন যখন রাজ্য নির্বাচনমুখী, তখনই এসব হচ্ছে। নাম কাটা হচ্ছে, আবার হেয়ারিং দেওয়ার নামে নাটক চলছে। তাহলে কোথায় নিরপেক্ষতা?” তাঁর মতে, কমিশনের অবস্থান সন্দেহজনক এবং তা জনগণের আস্থাকে নষ্ট করছে।
‘ভোটচুরি’ বিতর্কে নতুন মাত্রা
সম্প্রতি বিরোধী জোট INDIA কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে। সেই প্রেক্ষিতে কমিশনের পাল্টা বক্তব্য— কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া ‘চুরি’ শব্দ প্রয়োগ করা সাংবিধানিক নিয়মবিরুদ্ধ। আর এই মন্তব্য নিয়েই ক্ষোভ উগরে দেন চন্দ্রিমা। তাঁর কটাক্ষ, কমিশনের এই অবস্থান ভোটদাতাদের আস্থা নষ্ট করছে।

‘কমিশন কাজ করছে কেন্দ্রের পক্ষে’
চন্দ্রিমার মতে, কমিশন আদতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষেই কাজ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী কণ্ঠস্বর দমিয়ে রাখতে কমিশনকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিপন্ন হচ্ছে। তাঁর দাবি, বাংলার মানুষ এর সঠিক জবাব দেবেন নির্বাচনে।
গ্রামীণ ভোটার নিয়ে কটাক্ষ
গ্রামের ভোটাররা শহরে এসে ভোট দেন—কমিশনের এমন মন্তব্য নিয়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান চন্দ্রিমা। তিনি বলেন, “ওসব ছাড়ুন। গ্রাম থেকে শহরের দূরত্ব কমিশন বোঝে না। ডগ বাবুও এসেছে, ক্যাট বাবুও এসেছে—এসব বলে কোনও লাভ নেই।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, কমিশনের যুক্তি তিনি একেবারেই মানতে রাজি নন।
বাংলার প্রেক্ষাপটে নতুন সঙ্কট
এসআইআর নিয়ে বাংলায় আগেই তৃণমূল ও বিজেপির সংঘাত চরমে উঠেছে। বিজেপি মনে করছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ভোটার তালিকা পরিষ্কার হবে। অন্যদিকে তৃণমূল বলছে, এই পরিকল্পনার আড়ালে আসলে ভোটার তালিকায় গোপন কারসাজি চলছে। কমিশনের ঘোষণা ও চন্দ্রিমার কড়া আক্রমণে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হল।

গণতন্ত্র বনাম প্রশাসনিক প্রক্রিয়া
চন্দ্রিমার বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি এসআইআরকে শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন না। তাঁর মতে, গণতন্ত্রের মূল কাঠামো যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সেটি মেনে নেওয়া যাবে না। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, বাংলার মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্যই লড়াই করবেন।
কমিশন বনাম রাজ্য—সংঘাতের মঞ্চ প্রস্তুত
রাজ্য মন্ত্রী ও কমিশনের এই তীব্র দ্বন্দ্বে বোঝা যাচ্ছে, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হতে চলেছে। কমিশন যেখানে দাবি করছে সবাই সমকক্ষ, চন্দ্রিমা সেখানে নিরপেক্ষতার অভাবের অভিযোগ তুলে নতুন করে বিতর্ক জিইয়ে তুলেছেন।
সামনে কী হতে চলেছে
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, এসআইআর ঘিরে বাংলার রাজনীতি আরও উত্তাল হবে। কমিশনের ঘোষণা যেমন বিজেপিকে শক্তি জোগাচ্ছে, তেমনই তৃণমূল নেত্রী চন্দ্রিমার তোপ নতুন করে রাজ্যবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই রাজনৈতিক সংঘাত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়।









