দুর্গাপুজোর ভোজ মানেই যে সব সময় লুচি, পোলাও কিংবা মাংসের পদ থাকতে হবে, এমন নয়। বাঙালির চেনা ঘরোয়া রান্নাও উৎসবের খাবারে এনে দিতে পারে তৃপ্তির স্বাদ। আর সেই তালিকায় আলু পোস্তের জুড়ি মেলা ভার। বিশেষ করে পূর্ব বর্ধমানের রান্নার ধরনে পোস্তের সঙ্গে সরষে, তিল ও সুগন্ধি ফোড়নের মেলবন্ধন এই পদকে দেয় আলাদা পরিচিতি। বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের জন্য বিশেষ রান্না করতে চাইলে সহজ উপকরণেই বানিয়ে ফেলতে পারেন এই ঐতিহ্যবাহী পদ। রইল রান্নার পদ্ধতি ও স্বাদ বাড়ানোর কয়েকটি কৌশল।
![]()
আলু পোস্তে স্বাদের আসল রহস্য কোথায়?
বাঙালির রান্নাঘরে আলু পোস্তের জনপ্রিয়তা বহুদিনের। অল্প কিছু উপকরণে তৈরি এই পদ গরম ভাতের সঙ্গে খেতে যেমন ভালো লাগে, তেমনই প্রতিদিনের খাবারেও সহজে জায়গা করে নেয়। পূর্ব বর্ধমানে আলু পোস্তের নানা ঘরোয়া পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে।
এই বিশেষ রান্নার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পোস্তের সঙ্গে সাদা সরষে, কালো সরষে, সাদা তিল ও কাঁচালঙ্কা বেটে ব্যবহার করা। অন্যদিকে, সর্ষের তেলে কালোজিরে, শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা ও রসুনের ফোড়ন রান্নায় যোগ করে আলাদা সুগন্ধ। উপকরণগুলির পরিমাণ ও রান্নার পদ্ধতি অনুযায়ী স্বাদে কিছুটা পার্থক্য আসতে পারে।
কী কী উপকরণ লাগবে?
বাড়িতে বর্ধমান ঘরানার এই আলু পোস্ত বানাতে হাতের কাছে রাখুন—
- আলু
- পোস্ত
- সাদা সরষে
- কালো সরষে
- সাদা তিল
- কাঁচালঙ্কা
- সর্ষের তেল
- কালোজিরে
- শুকনো লঙ্কা
- তেজপাতা
- রসুন
- নুন
- সামান্য হলুদ
- অল্প চিনি, ইচ্ছা অনুযায়ী
উপকরণের পরিমাণ পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও ব্যক্তিগত স্বাদ অনুযায়ী ঠিক করে নিতে পারেন। সরষে ও কাঁচালঙ্কার পরিমাণ বেশি হলে ঝাঁজ বাড়বে, তাই নিজের পছন্দ বুঝে মশলা ব্যবহার করুন।
পোস্ত, সরষে ও তিল বেটে নিন
প্রথমে আলু খোসা ছাড়িয়ে মাঝারি আকারের টুকরো করে কেটে নিন। এরপর পোস্ত, সাদা সরষে, কালো সরষে, সাদা তিল ও কাঁচালঙ্কা একসঙ্গে বেটে মশলার মিশ্রণ তৈরি করুন।
মশলা বাটার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প জল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মিশ্রণ যেন অতিরিক্ত পাতলা না হয়ে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। মশলার এই মিশ্রণই রান্নায় পোস্তের স্বাদের পাশাপাশি সরষে ও তিলের আলাদা ঘ্রাণ যোগ করবে।
সঠিক ফোড়নে তৈরি করুন সুগন্ধ
এবার কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করুন। তেল গরম হলে তাতে কালোজিরে, শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা ও রসুন দিন। ফোড়ন থেকে সুন্দর গন্ধ বেরোতে শুরু করলে কেটে রাখা আলু কড়াইয়ে দিয়ে নাড়াচাড়া করুন।
আলুর সঙ্গে স্বাদ অনুযায়ী নুন ও সামান্য হলুদ মিশিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে আলু কিছুটা ভাজা হতে দিন। ফোড়ন দেওয়ার সময় খেয়াল রাখুন, রসুন বা শুকনো লঙ্কা যেন পুড়ে না যায়। পুড়ে গেলে রান্নার স্বাদ তেতো হয়ে যেতে পারে।
![]()
মশলা কষিয়ে কম আঁচে সেদ্ধ করুন আলু
আলু অর্ধেকের বেশি ভাজা হয়ে এলে আগে থেকে বেটে রাখা পোস্ত, সরষে, তিল ও কাঁচালঙ্কার মিশ্রণ কড়াইয়ে দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। কিছুক্ষণ কষিয়ে রান্না করুন, যাতে মশলার কাঁচা গন্ধ কমে আসে।
এরপর অল্প গরম জল দিয়ে কড়াই ঢাকা দিন। কম আঁচে রান্না হতে দিন, যতক্ষণ না আলু ভালোভাবে সেদ্ধ হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে নেড়ে দেখে নিন, যাতে মশলা কড়াইয়ের তলায় লেগে না যায়। খুব বেশি জল দেবেন না, কারণ এই পদের বৈশিষ্ট্য হল মাখামাখা মশলার সঙ্গে আলুর সুন্দর মেলবন্ধন।
আরও সহজ পদ্ধতি: আগে আলু হালকা সেদ্ধ করে নিন
যাঁরা রান্নার সময় কিছুটা কমাতে চান, তাঁরা বিকল্প পদ্ধতিও অনুসরণ করতে পারেন। প্রথমে আলু হালকা সেদ্ধ করে নিন। এরপর কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে পছন্দমতো ফোড়ন দিন।
ফোড়নের গন্ধ বেরোলে সেদ্ধ আলু দিয়ে ভালোভাবে নাড়াচাড়া করুন। তারপর বেটে রাখা পোস্তের মিশ্রণ যোগ করে সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। কড়াই ঢাকা দিয়ে অল্প আঁচে রান্না করুন, যাতে আলুর সঙ্গে পোস্তের স্বাদ ভালোভাবে মিশে যায়।
এই পদ্ধতিতে আলু আগে থেকেই কিছুটা সেদ্ধ থাকায় রান্নার সময় কম লাগতে পারে। তবে আলু অতিরিক্ত সেদ্ধ করে ফেলবেন না, নইলে নাড়াচাড়া করার সময় তা ভেঙে যেতে পারে।
শেষে সামান্য সর্ষের তেল ও কাঁচালঙ্কায় বাড়বে স্বাদ
রান্না মাখামাখা হয়ে এলে স্বাদ অনুযায়ী সামান্য সর্ষের তেল ও চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে নামিয়ে নিতে পারেন। এতে সর্ষের তেলের পরিচিত ঝাঁজ ও কাঁচালঙ্কার সুগন্ধ আরও স্পষ্ট হবে।
কেউ কেউ রান্নার শেষ পর্যায়ে অল্প চিনি যোগ করেন। এতে স্বাদে হালকা মিষ্টির ছোঁয়া আসে। তবে চিনি দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। নিজের পছন্দ অনুযায়ী এই ধাপটি বাদও দিতে পারেন।
গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন এই ঘরোয়া আলু পোস্ত। পুজোর দিনে সাধারণ উপকরণেই তৈরি হয়ে যাবে বাঙালির চিরপরিচিত এক সুস্বাদু পদ।
![]()
বাঙালির পাতে গরম ভাতের সঙ্গে আলু পোস্ত থাকলে জমে যায় দুপুরের খাওয়াদাওয়া। বিশেষ করে পূর্ব বর্ধমানের ঘরোয়া রান্নায় এই পদের জনপ্রিয়তা বরাবরই বেশি। তবে শুধু আলু আর পোস্ত দিয়ে নয়, সঠিক ফোড়ন ও মশলার মিশেলেও এই পরিচিত রান্নায় আনা যায় অন্যরকম স্বাদ। পোস্ত, সাদা-কালো সরষে, সাদা তিল ও কাঁচালঙ্কা বেটে তৈরি মশলার সঙ্গে কালোজিরে, শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা ও রসুনের ফোড়ন—এই বিশেষ সমন্বয়েই তৈরি হতে পারে সুস্বাদু বর্ধমান ঘরানার আলু পোস্ত।








