উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ নির্বাচন: জোটের প্রস্তাব ও অখিলেশ যাদবকে নিশানা ওয়াইসির

উত্তরপ্রদেশের ২০২৭ বিধানসভা নির্বাচনের আগে কানপুরের জনসভায় অখিলেশ যাদব ও মুজফ্ফরনগর দাঙ্গা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। BJP-কে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসা থেকে আটকাতে বিরোধী দলগুলির সঙ্গে জোটের প্রস্তাব দেন তিনি এবং ২ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষার কথা জানান।
উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ নির্বাচন: জোটের প্রস্তাব ও অখিলেশ যাদবকে নিশানা ওয়াইসির
Photo Credit / Attribution: Google

উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। এর মধ্যেই অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM)-এর প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি কানপুরে একটি জনসভায় সমাজবাদী পার্টির (SP) সভাপতি অখিলেশ যাদবকে নিশানা করেন এবং তাঁর মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২০১৩ সালের মুজফ্ফরনগর দাঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে ওয়াইসি প্রশ্ন করেন, অখিলেশ যাদব ক্ষমতায় থাকাকালীন কতগুলি দাঙ্গা হয়েছিল। একই সঙ্গে উত্তরপ্রদেশে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)-কে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসা থেকে আটকাতে বিরোধী দলগুলির কাছে জোটের প্রস্তাব দেন তিনি।

রবিবার কানপুরের ক্যান্ট এলাকার বাবুপুরওয়া ঈদগাহ মাঠে জনসভায় ভাষণ দেন ওয়াইসি। সেখানে তিনি ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে AIMIM-এর কৌশল সম্পর্কেও বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, উত্তরপ্রদেশে BJP-কে ফের সরকার গঠন থেকে আটকাতে চায় এমন দলগুলির সঙ্গে জোট করতে তাঁর দল প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্দেশ্যে বিরোধী দলগুলি একসঙ্গে আসতে চাইলে AIMIM তাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত।

ভাষণে সমাজবাদী পার্টি এবং অখিলেশ যাদবকে নিয়ে ওয়াইসি বলেন, নির্বাচনের সময় ‘অখিলেশ ভাইয়া আসছেন’ ধরনের স্লোগান শোনা যায়। এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, অখিলেশ যাদব ক্ষমতায় আসার পর সেই সময় কতগুলি দাঙ্গা হয়েছিল। এর পর তিনি ২০১৩ সালের মুজফ্ফরনগর দাঙ্গার উল্লেখ করে বলেন, ওই ঘটনার সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁদের বাড়ি ও গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। তাঁর ভাষণে তিনি প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরিসংখ্যান উল্লেখ করেন।

২০১৩ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে মুজফ্ফরনগরে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে। ওয়াইসি তাঁর ভাষণে এই ঘটনাকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের মেয়াদের সঙ্গে যুক্ত করে সমাজবাদী পার্টিকে রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখে ফেলেন। এই বক্তব্য ওয়াইসির রাজনৈতিক অভিযোগ এবং ভাষণের অংশ; এর মাধ্যমে কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত দায় বা কোনও সরকারের আইনি দোষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।

ওয়াইসি মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত সমস্যা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেওয়া মানুষদের নিজেদের উন্নয়ন, শিক্ষা এবং প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নও তুলতে হবে। বিধানসভায় সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার কথা বলে AIMIM-এর রাজনৈতিক উপস্থিতি শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।

জনসভায় ওয়াইসি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে দলের প্রস্তুতির কথাও জানান। তিনি বলেন, উত্তরপ্রদেশে AIMIM এখনও আসনের কোনও সরকারি ঘোষণা করেনি এবং জেলাভিত্তিক সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা BJP-কে তৃতীয়বার সরকার গঠন থেকে আটকাতে চান, তারা AIMIM-এর সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারেন।

ওয়াইসি বলেন, সম্ভাব্য জোট নিয়ে তাঁর দল ২ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে এবং জোট হলে তার পর ঘোষণা করা হবে। অর্থাৎ, বর্তমানে তাঁর বক্তব্যকে কোনও চূড়ান্ত জোট ঘোষণার হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিতে কোনও নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা বা আনুষ্ঠানিক চুক্তির ঘোষণা করা হয়নি।

ওয়াইসি তাঁর ভাষণে বিহার বিধানসভা নির্বাচনেরও উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, বিহার নির্বাচনের আগে AIMIM রাষ্ট্রীয় জনতা দল (RJD), কংগ্রেস, CPI এবং অন্যান্য বামপন্থী দলের নেতাদের চিঠি লিখে জোটের অধীনে ছয়টি আসনে নির্বাচনে লড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি এবং পরিবর্তে তাঁর দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল। এটি ওয়াইসির ভাষণে উপস্থাপিত একটি রাজনৈতিক দাবি।

উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন এখনও সামনে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের কৌশল তৈরি করছে। AIMIM এর আগেও উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনে লড়েছে এবং ওয়াইসি রাজ্যে দলের সংগঠন সম্প্রসারণের কথা বলে আসছেন। এবার তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল জোটের সম্ভাবনা এবং বিরোধী দলগুলির সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব।

ওয়াইসি তাঁর ভাষণে BJP সরকারের নীতি এবং উত্তরপ্রদেশে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি মাদ্রাসা, কর্মসংস্থান এবং কয়েকটি প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে সরকারের সমালোচনা করেন। তাঁর এই বক্তব্যগুলিও রাজনৈতিক অভিযোগ এবং বিরোধী নেতার বক্তব্য হিসেবে বিবেচ্য। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিতে সরকার বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বক্তব্য পৃথক হতে পারে।

তিনি রাষ্ট্রীয় লোকদল (RLD)-এর প্রধান জয়ন্ত চৌধুরীরও উল্লেখ করেন এবং বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। BJP-র সঙ্গে জয়ন্ত চৌধুরীর যাওয়া নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের উল্লেখ করে ওয়াইসি বলেন, তিনি তাঁকে সম্মান করেন। এই মন্তব্যও কানপুরের ভাষণের অংশ ছিল।

উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে AIMIM-এর এই জোটের প্রস্তাব এমন সময় এসেছে, যখন ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলগুলির মধ্যে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখনও কোন কোন দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক জোট হবে, তা স্পষ্ট নয়। ওয়াইসি তাঁর পক্ষ থেকে জোটের জন্য দরজা খোলা রাখার কথা বলেছেন এবং ২ অক্টোবরের মধ্যে পরিস্থিতি স্পষ্ট করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি এবং AIMIM-এর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আগেও প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক বক্তব্যে ওয়াইসি সরাসরি অখিলেশ যাদবের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময় এবং মুজফ্ফরনগর দাঙ্গার প্রসঙ্গ তোলেন। অন্যদিকে, জোটের প্রশ্নে তিনি বিরোধী দলগুলির সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। ফলে তাঁর বক্তব্যে একদিকে সমাজবাদী পার্টির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ এবং অন্যদিকে বৃহত্তর বিরোধী জোটের জন্য আলোচনার প্রস্তাব—দুই দিকই রয়েছে।

এই মুহূর্তে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৭-এর জন্য কোনও চূড়ান্ত জোটের ছবি সামনে আসেনি। AIMIM জোটের প্রস্তাব দিয়েছে এবং ২ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা জানিয়েছে। আগামী দিনে অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই প্রস্তাবে কী প্রতিক্রিয়া জানায়, তার ওপর রাজ্যে সম্ভাব্য নির্বাচনী সমীকরণ নিয়ে আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।

Leave a comment