ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর শেষকৃত্য ও শেষযাত্রা উপলক্ষে রাজধানী তেহরানে বিপুল জনসমাগম হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। সোমবার অনুষ্ঠিত শেষযাত্রায় ধর্মীয় নেতা, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক কমান্ডার এবং বিদেশি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিলেন। এই শেষকৃত্য এমন সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। ফলে এই অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক নজর কেড়েছে।
রবিবার অনুষ্ঠিত জানাজায় খামেনেইর তিন ছেলে—মাসউদ খামেনেই, মেইসম খামেনেই এবং মুস্তফা খামেনেই—উপস্থিত ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত মুজতবা খামেনেই প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানে দেখা যাননি। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণ এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তিনি জনসমক্ষে উপস্থিত হননি। তবে এ বিষয়ে ইরানি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ দেওয়া হয়নি।
সোমবার সকালে রাজধানী তেহরানে খামেনেইর শেষযাত্রা বের করা হয়। কফিনটি শহরের প্রধান সড়কগুলো দিয়ে নেওয়া হয়, যেখানে হাজার নয়, লাখো মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন। ইমাম খোমেইনি মোসাল্লা গ্র্যান্ড মসজিদ থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বিভিন্ন স্থানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন ছিল।
শেষকৃত্যের সময় উপস্থিত জনতার একাংশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অংশের মানুষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের জবাব দেওয়ার দাবি জানান। তবে এসব স্লোগান পুরো অনুষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেছিল, নাকি কেবল জনতার একটি অংশের প্রতিক্রিয়া ছিল, তা স্পষ্ট নয়।
তেহরানে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মানুষ শেষযাত্রায় অংশ নেন। গরম থেকে স্বস্তি দিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে পানি ছিটানো হয়। পাশাপাশি উপস্থিত মানুষদের ঠান্ডা পানি, শীতল পানীয় এবং তরমুজ বিতরণ করা হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, এটি শুধু বিদায়ের অনুষ্ঠান নয়, বরং খামেনেইর চিন্তাধারা ও তার মিশন এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার। তিনি বলেন, শেষকৃত্যে মানুষের উপস্থিতি তাদের নেতার প্রতি গভীর সম্মানের প্রতিফলন। তার মতে, কোনো রাজনৈতিক আহ্বানে এত মানুষের সমাগম সম্ভব নয়।
ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কৌশলগত সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। ইয়েমেনের উপ-রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আল-নুয়াইমির সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সংগঠনগুলোর বাস্তব শক্তি স্বীকার করতে হয়েছে। তিনি এটিকে ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন বলে উল্লেখ করেন।
![]()
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, শেষকৃত্যের সময় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এক স্থানে উপস্থিত ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারত। তবে তিনি বলেন, আলোচনার সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নেয়নি। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর ইরানের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
আর্মেনিয়ায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাস ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করে জানায়, সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো আদর্শকে নির্মূল করা যায় না। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো জাতির পরিচয় শুধু তার সামরিক সক্ষমতায় নয়, বরং তার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জনগণের ইচ্ছাশক্তিতে নিহিত।
ইরানি সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আক্রমিনিয়া বলেন, যুদ্ধবিরতির সময় দেশটি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে ব্যবহার করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো সামরিক পদক্ষেপ হলে ইরান তার "সিদ্ধান্তমূলক ও কার্যকর জবাব" দেবে। এই বক্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন অঞ্চলের উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শক্তি। তিনি বলেন, বিশ্বের বড় অংশের তেল রপ্তানি এই সমুদ্রপথ দিয়ে হয়। ফলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বিস্তৃত প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলোর জোট OPEC+ আগস্ট থেকে তেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে, যার ফলে দামের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। তবে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিলে তেলের বাজার আবারও অস্থির হতে পারে।
OPEC (Organization of the Petroleum Exporting Countries) ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তেল উৎপাদন নীতিতে সমন্বয় সাধন এবং বৈশ্বিক বাজারে তেলের দামের ভারসাম্য বজায় রাখা। অন্যদিকে OPEC+ আলাদা কোনো সংস্থা নয়; এটি OPEC এবং এর বাইরের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলোর একটি জোট। বৈশ্বিক তেলবাজারের অতিরিক্ত অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে এই জোট গঠিত হয়।
বর্তমানে OPEC+ বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে এবং বৈশ্বিক তেল মজুদের বড় অংশ এর সদস্য দেশগুলোর কাছে রয়েছে। ফলে উৎপাদনসংক্রান্ত এই জোটের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
খামেনেইর শেষযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় বা জাতীয় অনুষ্ঠান ছিল না, বরং পশ্চিম এশিয়ার পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও একটি ইঙ্গিত হিসেবে উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে জনসমাগম, ইরানি নেতৃত্বের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া এবং তেলবাজার-সংক্রান্ত ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে আঞ্চলিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর আন্তর্জাতিক নজর অব্যাহত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা আবার বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।








