দুর্গাপুজোর আগে রাজবাড়িতে অদ্ভুত খেলা! কাদামাখা শরীরে খাড়া বাঁশ বেয়ে উঠলেই মিলবে ৫০১ টাকা, আজও বেঁচে ৫১৭ বছরের ঐতিহ্য

৫১৭ বছরের বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে আজও পালিত হয় শতবর্ষের ‘কাঁদো খেলা’। কাদামাখা শরীরে বাঁশ বেয়ে উঠে পুঁটলি নামাতে পারলেই মিলবে ৫০১ টাকা।

জলপাইগুড়ি: উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হতেই জমে উঠল এক অভিনব লোকখেলা। শনিবার শাস্ত্রীয় রীতি মেনে ৫১৭ বছরের প্রাচীন দেবী দুর্গার কাঠামো পুজো অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এদিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে ‘কাঁদো খেলা’। পিচ্ছিল কাদা মাড়িয়ে উঁচু বাঁশের মাথায় পৌঁছে গোপন পুঁটলি উদ্ধার করার এই প্রতিযোগিতা দেখতে ভিড় জমান বহু মানুষ।

দুর্গাপুজোর আগে রাজবাড়িতে অদ্ভুত খেলা! কাদামাখা শরীরে খাড়া বাঁশ বেয়ে উঠলেই মিলবে ৫০১ টাকা, আজও বেঁচে ৫১৭ বছরের ঐতিহ্য
৫১৭ বছরের পুজোয় শুরু দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি

জন্মাষ্টমীর উৎসব শেষ হতে না হতেই ঢাকের বাদ্যি ও শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ি চত্বর। দীর্ঘদিনের রাজকীয় পরম্পরা ও ধর্মীয় রীতি মেনে শনিবার অনুষ্ঠিত হয় দেবীর কাঠামো পুজো।এই পুজোর ইতিহাস ৫১৭ বছরের পুরনো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নানা আচার-অনুষ্ঠান ও লোকসংস্কৃতির ধারাকে সঙ্গে নিয়েই এখানে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে।

পুজোর থেকেও নজর কাড়ল ‘কাঁদো খেলা’

রাজবাড়ির পুজো দেখতে আসা ভক্তদের কাছে এদিন অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘কাঁদো খেলা’। এটি কোনও আধুনিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্থানীয় লোকাচার।শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীতে মাখন হাঁড়ি ভাঙার যে উন্মাদনা দেখা যায়, ‘কাঁদো খেলা’-তেও অনেকটা তেমনই দলগত উত্তেজনা ও প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। ছোট থেকে প্রবীণ—বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই লোকাচারের সঙ্গে যুক্ত হন।

বাঁশের মাথায় লুকিয়ে থাকে ৫০১ টাকার পুঁটলি

এই খেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি হয় একটি দীর্ঘ বাঁশকে ঘিরে। কাঁদার প্রান্তে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বিশালাকার একটি বাঁশ। তার একেবারে চূড়ায় আগে থেকেই বেঁধে রাখা হয় একটি পুঁটলি।সেই পুঁটলির মধ্যেই থাকে নগদ ৫০১ টাকা। এরপর শুরু হয় আসল লড়াই। কাদামাখা ও পিচ্ছিল শরীর নিয়ে প্রতিযোগীদের বাঁশ বেয়ে যত দ্রুত সম্ভব উপরে উঠতে হয়।বাঁশটি পিচ্ছিল থাকায় মাঝপথে বারবার পিছলে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে যত উপরে ওঠা যায়, ততই বাড়তে থাকে উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত যে প্রতিযোগী সবার আগে বাঁশের চূড়ায় পৌঁছে পুঁটলি নামিয়ে আনতে পারেন, তিনিই হন বিজয়ী।

দুর্গাপুজোর আগে রাজবাড়িতে অদ্ভুত খেলা! কাদামাখা শরীরে খাড়া বাঁশ বেয়ে উঠলেই মিলবে ৫০১ টাকা, আজও বেঁচে ৫১৭ বছরের ঐতিহ্য
খেলার কাদাই পরে লাগে দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে

শুধু বিনোদন বা পুরস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এই লোকাচার। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর ধর্মীয় বিশ্বাসও।রাজবাড়ির পুরোহিত শিবু ঘোষালের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘কাঁদো খেলা’ শেষ হওয়ার পর মাঠে জমে থাকা কাদা-মাটি সংগ্রহ করে রাখা হয়। পরে নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধি মেনে সেই মাটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেন মৃৎশিল্পীরা।অর্থাৎ, লোকাচারের সঙ্গে দুর্গাপুজোর মূল আচারও এখানে এক বিশেষ সূত্রে যুক্ত হয়ে যায়।

প্রসাদী খিচুড়িতে শেষ হল আয়োজন

৫১৭ বছরের পুরনো এই উৎসবকে ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই রাজবাড়ি চত্বরে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কাঠামো পুজো ও ‘কাঁদো খেলা’ ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত ভক্তদের হাতে তুলে দেওয়া হয় রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী প্রসাদী খিচুড়ি ভোগ।

আধুনিকতার মাঝেও অমলিন প্রাচীন পরম্পরা

সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রাও। বহু পুরনো লোকাচার ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আধুনিকতার চাপে। কিন্তু বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো এখনও ধরে রেখেছে তার বহু শতাব্দীর পুরনো ঐতিহ্য।দেবীর কাঠামো পুজো থেকে ‘কাঁদো খেলা’, আর শেষে প্রসাদী খিচুড়ি—সব মিলিয়ে এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতিরও এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

দুর্গাপুজোর আগে রাজবাড়িতে অদ্ভুত খেলা! কাদামাখা শরীরে খাড়া বাঁশ বেয়ে উঠলেই মিলবে ৫০১ টাকা, আজও বেঁচে ৫১৭ বছরের ঐতিহ্য
জন্মাষ্টমীর রেশ কাটতে না কাটতেই দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে মেতে উঠল জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ি। শনিবার ৫১৭ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজোর কাঠামো পুজো সম্পন্ন হয়। তবে পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে শতবর্ষের পুরনো লোকাচার ‘কাঁদো খেলা’। কাদায় মাখামাখি হয়ে লম্বা বাঁশের চূড়ায় উঠে গোপন পুঁটলি নামিয়ে আনতে পারলেই বিজয়ীর হাতে ওঠে নগদ ৫০১ টাকা।

Leave a comment