দশমীর দিন উমাকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে বাঙালির মনে যেমন বিষাদের সুর বাজে, তেমনই নানা প্রাচীন রীতির মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকে উৎসবের ঐতিহ্য। জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে সেই ঐতিহ্যেরই এক ব্যতিক্রমী ছবি দেখা যায়। এখানে দেবী দুর্গার দশমীর ভোগে থাকে পান্তা ভাত, ইলিশ ভাজা, কচুশাক ও পুঁটি মাছের মতো পরিচিত বাঙালি পদ। প্রায় পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই রীতি আজও আকর্ষণ করে দর্শনার্থীদের।
৫১৭ বছরের ঐতিহ্যে আজও অটুট রাজবাড়ির দুর্গাপুজো
বাংলার বিভিন্ন বনেদি বাড়িতে দুর্গাপুজোকে ঘিরে রয়েছে নানা প্রাচীন প্রথা। কোথাও বিশেষ পুজোর নিয়ম, কোথাও নির্দিষ্ট ভোগ, আবার কোথাও দেবীকে বিদায় জানানোর নিজস্ব রীতি। জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজোও তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।প্রচলিত রীতি অনুসারে, বিজয়া দশমীতে দেবীকে নিবেদন করা হয় আমিষ ভোগ। চলতি বছরেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। পান্তা ভাত, ভাজা ইলিশ, কচুশাক এবং পুঁটি মাছ দিয়ে সাজানো হয় ভোগের থালা। এই খাবারগুলির মধ্য দিয়ে উঠে আসে বাংলার চেনা খাদ্যসংস্কৃতি ও ঘরোয়া স্বাদের পরিচয়।
পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ, কচুশাক ও পুঁটি মাছ
দশমীর বিশেষ ভোগে থাকে এমন কিছু পদ, যা বাঙালির দৈনন্দিন খাবারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কাঁসার থালায় পান্তা ভাতের পাশে সাজানো হয় ইলিশ মাছ ভাজা, কচুশাক ও পুঁটি মাছ ভাজা।রাজবাড়ির এই আয়োজনের বিশেষত্ব শুধু খাবারের বৈচিত্র্যে নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রীতিকে ধরে রাখার মধ্যেও রয়েছে। আধুনিক সময়ে পুজোর আয়োজন যতই বদলাক, এই প্রাচীন ভোগের রীতি বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে।
মাইকের আওয়াজ নয়, বিদায়ের সুরে থাকে ঢাক
বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দশমীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল বিদায়পর্বের পরিবেশ। এখানে কৃত্রিম শব্দের আড়ম্বরের বদলে ঢাকের তালে দেবীকে বিদায় জানানোর রীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে তৈরি করে আবেগঘন আবহ। সেই পরিবেশে প্রাচীন পুজোর ঐতিহ্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই বিশেষ রীতি ও দশমীর ভোগ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ রাজবাড়িতে উপস্থিত হন।
ভোগের পর সিঁদুর খেলা, নাচ ও আবেগঘন বিদায়
দেবীকে ভোগ নিবেদনের পর শুরু হয় সিঁদুর খেলা ও নাচের পর্ব। ঢাকের শব্দ এবং শাঁখের ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে রাজবাড়ির আঙিনা। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে উমাকে বিদায় জানানোর মনখারাপ।দশমীর এই মুহূর্তে উপস্থিত ভক্তদের আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে সিঁদুর খেলা ও মিলনের আনন্দ, অন্যদিকে দেবীর বিদায়ের বিষাদ—সব মিলিয়ে বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় তৈরি হয় এক বিশেষ অনুভূতি।
বাংলার দুর্গাপুজো মানেই নানা বনেদি বাড়ির নিজস্ব রীতি ও প্রাচীন ঐতিহ্য। জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে বিজয়া দশমীর ভোগে আজও বিশেষ গুরুত্ব পায় সাবেকি বাঙালি খাবার। ৫১৭ বছরের ঐতিহ্য মেনে দেবী দুর্গাকে নিবেদন করা হয় পান্তা ভাত, ইলিশ মাছ ভাজা, কচুশাক ও পুঁটি মাছ। ঢাকের আওয়াজ, সিঁদুর খেলা ও আবেগঘন বিদায়পর্বে এই রাজবাড়ির পুজোয় ফুটে ওঠে বাংলার সংস্কৃতির নিজস্ব রূপ।












