অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স যখন বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ, তখন জঙ্গলমহলের এক পরিচিত ঔষধি উদ্ভিদ নতুন আশার আলো দেখাল। ‘কাঁটা বিশল্যকরণী’ নামের এই উদ্ভিদের পাতার নির্যাস ত্বকের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। বাঁকুড়ার অধ্যাপক সরোজ বল্লভের এই গবেষণা ইতিমধ্যেই বিজ্ঞান মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
জঙ্গলমহলের গাছে মিলল চিকিৎসার নতুন সম্ভাবনা
পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল অঞ্চলে সহজেই দেখা মেলে ‘কাঁটা বিশল্যকরণী’ গাছের। দীর্ঘদিন ধরে লোকজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার থাকলেও এবার বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এল এর নতুন গুণাগুণ। গবেষকদের দাবি, এই উদ্ভিদের পাতার নির্যাস ত্বকের সংক্রমণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াসের বিরুদ্ধে আশাব্যঞ্জক ফলাফল
গবেষণায় বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছিল Staphylococcus aureus নামক ব্যাকটেরিয়ার উপর। এই জীবাণু থেকে ত্বকের নানা জটিল সংক্রমণ তৈরি হতে পারে। পরীক্ষাগারে দেখা গিয়েছে, Barleria lupulina বা কাঁটা বিশল্যকরণীর পাতার নির্যাস এই ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সংক্রমণ প্রতিরোধে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের যুগে নতুন দিশা
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। বহু জীবাণু প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক উৎস থেকে নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান খুঁজে বের করা বিজ্ঞানীদের অন্যতম লক্ষ্য। গবেষকদের মতে, কাঁটা বিশল্যকরণীর নির্যাস সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
বহু প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টায় গবেষণার সাফল্য
এই গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে ঝাড়গ্রাম সাধু রামচাঁদ মুর্মু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপিকা চন্দ্রদীপা ঘোষের তত্ত্বাবধানে। গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতা করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান Bose Institute-সহ একাধিক বৈজ্ঞানিক সংস্থা। দীর্ঘদিনের পরীক্ষানিরীক্ষা, তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের পর এই ফলাফল সামনে এসেছে।
বিজ্ঞান কংগ্রেসে স্বীকৃতি, গর্বিত বাঁকুড়া
গবেষণাটি সম্প্রতি বিজ্ঞান কংগ্রেসে সেরা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় শিক্ষা ও গবেষণা মহলে উৎসাহের সঞ্চার হয়েছে। অধ্যাপক সরোজ বল্লভ তাঁর এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। জঙ্গলমহলের প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে এমন উচ্চমানের গবেষণা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশীয় উদ্ভিদ সম্পদের গুরুত্ব আরও একবার প্রমাণিত
বিশেষজ্ঞদের মতে, জঙ্গলমহলের বহু ঔষধিগুণসম্পন্ন উদ্ভিদ এখনও পর্যাপ্ত গবেষণার আওতার বাইরে। কাঁটা বিশল্যকরণী নিয়ে এই সাফল্য শুধু নতুন ওষুধ আবিষ্কারের সম্ভাবনাই তৈরি করেনি, বরং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও দেশীয় উদ্ভিদসম্পদের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
জঙ্গলমহলে জন্মানো ‘কাঁটা বিশল্যকরণী’ উদ্ভিদের পাতার নির্যাস ত্বকের জেদি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর হতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এই গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন বিষ্ণুপুর রামানন্দ কলেজের অধ্যাপক সরোজ বল্লভ। গবেষণাটি ভবিষ্যতে নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ আবিষ্কারের পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।













