ক্যালসিয়াম খেলেই কি কিডনিতে পাথর? হাড় মজবুত করতে গিয়ে কী ভুল করছেন, জানুন পুষ্টিবিদের পরামর্শ

ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার কি কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়ায়? দুধ, দই, অক্সালেট, নুন ও জল খাওয়ার বিষয়ে পুষ্টিবিদের পরামর্শ জানুন।

কিডনিতে পাথর হলে তীব্র যন্ত্রণা থেকে শুরু করে প্রস্রাবের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই এই সমস্যা এড়াতে অনেকেই নিজের মতো করে খাবারের তালিকা থেকে একের পর এক উপাদান বাদ দিতে শুরু করেন। ক্যালসিয়াম নিয়েও রয়েছে এমনই একটি প্রচলিত ধারণা—দুধ বা ক্যালসিয়াম খেলেই নাকি কিডনিতে পাথর তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবে পর্যাপ্ত খাদ্যতালিকাগত ক্যালসিয়াম সবসময় কিডনি স্টোনের ঝুঁকি বাড়ায় না। বরং ক্যালসিয়াম ও অক্সালেটের ভারসাম্য, পর্যাপ্ত জল এবং কম নুন খাওয়ার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ক্যালসিয়াম খেলেই কি কিডনিতে পাথর হয়?

অনেকের ধারণা, দুধ, দই বা অন্যান্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেলেই কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কিন্তু পুষ্টিবিদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।বরং খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে অক্সালেটযুক্ত খাবারের সঙ্গে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করলে অন্ত্রে ক্যালসিয়াম ও অক্সালেটের সংযোগ তৈরি হয়, যার ফলে অক্সালেটের একটি অংশ শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। তাই কিডনি স্টোনের ভয় পেয়ে নিজের ইচ্ছায় দুধ বা অন্যান্য ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।তবে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত মাত্রায় কোনও সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়।

পর্যাপ্ত জলই কিডনি স্টোন প্রতিরোধের অন্যতম চাবিকাঠি

কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসগুলির একটি হল পর্যাপ্ত তরল পান করা। শরীরে পর্যাপ্ত জল থাকলে প্রস্রাব পাতলা থাকে এবং পাথর তৈরির উপাদানগুলির ঘনত্ব কমতে সাহায্য করে।তবে সবার জন্য একই পরিমাণ জল প্রয়োজন হয় না। আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম, বয়স, ওজন এবং কিডনির স্বাস্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজন বদলাতে পারে। তাই নিজের শারীরিক পরিস্থিতি অনুযায়ী পর্যাপ্ত জল পান করাই গুরুত্বপূর্ণ।

নুন বেশি খেলেও বাড়তে পারে ঝুঁকি

খাবারে অতিরিক্ত সোডিয়াম বা নুন খাওয়ার অভ্যাস কিডনি স্টোনের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। বেশি সোডিয়াম গ্রহণের ফলে প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বাড়তে পারে, যা কিছু ধরনের কিডনি স্টোন তৈরির সম্ভাবনা বাড়ায়।তাই রান্নায় অতিরিক্ত নুন, খাবারের সঙ্গে কাঁচা নুন এবং অতিরিক্ত নোনতা প্যাকেটজাত খাবার কমানো উচিত। চিপস, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ফাস্ট ফুডেও সোডিয়াম বেশি থাকতে পারে।

অক্সালেটযুক্ত খাবার নিয়ে কী সতর্কতা?

কিছু খাবারে প্রাকৃতিকভাবে অক্সালেটের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে। যেমন পালং শাক, বিট, কিছু বাদাম ও চকোলেট। যাঁদের ক্যালসিয়াম অক্সালেট স্টোন হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই খাবারগুলির পরিমাণ এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ে চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।তবে শুধু অক্সালেটযুক্ত খাবার দেখেই সবকিছু বাদ দেওয়ার দরকার নেই। ব্যক্তির পাথরের ধরন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

অতিরিক্ত প্রাণীজ প্রোটিনেও নজর দিন

তাই প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিনের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ডাল, শস্য, শাকসবজি এবং অন্যান্য উদ্ভিদজাত খাবার খাদ্যতালিকায় রাখাও উপকারী হতে পারে।

কিডনি স্টোন এড়াতে কী করবেন?

কিডনি স্টোনের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে—

পর্যাপ্ত জল ও তরল পান করুন।

অতিরিক্ত নুন খাওয়ার অভ্যাস কমান।

প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করুন।

অতিরিক্ত প্রাণীজ প্রোটিন এড়িয়ে চলুন।

নিজের ইচ্ছায় ক্যালসিয়াম পুরোপুরি বাদ দেবেন না।

ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কিডনিতে আগে পাথর হয়ে থাকলে পাথরের ধরন অনুযায়ী ডায়েট ঠিক করুন।

কিডনিতে পাথর হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই দুধ, দই বা ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম খাওয়াই কি সত্যিই কিডনি স্টোনের কারণ? পুষ্টিবিদের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। পর্যাপ্ত জল পান, নুন নিয়ন্ত্রণ এবং খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও অক্সালেটযুক্ত খাবার কীভাবে খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a comment