বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চিনের আর্থিক কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে কমেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অন্যদিকে বেড়েছে সোনার ভাণ্ডার। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চিনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সোনার মজুত বেড়ে প্রায় ২,৪০৯.৫৯ টনে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ডলারের রিজার্ভ কমার সঙ্গে সোনা কেনার সম্পর্ক ঠিক কতটা? কেনই বা দীর্ঘদিন ধরে সোনার মজুত বাড়িয়ে চলেছে চিন? জেনে নিন বিস্তারিত।
সেপ্টেম্বরে প্রায় ২৩ টন সোনা কিনেছে চিন?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চিনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক পিপলস ব্যাঙ্ক অফ চায়না (PBoC)-র সোনার মজুত ২০২৬ সালের অগস্টের শেষে ছিল প্রায় ৭৬.৭৩ মিলিয়ন ফাইন ট্রয় আউন্স। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৭.৪৭ মিলিয়ন ট্রয় আউন্সে।
অর্থাৎ, এক মাসে সোনার মজুত বেড়েছে প্রায় ৭.৪ লক্ষ ট্রয় আউন্স, যা ওজনের হিসাবে প্রায় ২৩ টন। প্রতিবেদনে এই অতিরিক্ত সোনার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৯,৪১৮ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও দাবি করা হয়েছে, সেপ্টেম্বর ছিল চিনের সোনার মজুত বৃদ্ধির টানা ২৩তম মাস। অর্থাৎ, দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে নিজেদের স্বর্ণভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে।
চিনের কোষাগারে মোট কত সোনা রয়েছে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে চিনের কাছে মোট সোনার মজুত ছিল প্রায় ২,৪০৯.৫৯ টন। আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে এই সোনার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০.৮০ লক্ষ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে সোনার আন্তর্জাতিক দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। ফলে একই পরিমাণ সোনার আর্থিক মূল্যও পরিবর্তিত হতে পারে। এই কারণে সোনার মোট মূল্যকে স্থায়ী অঙ্ক হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এক মাসে ৩৮ বিলিয়ন ডলার কমল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
চিনের সোনার মজুত বৃদ্ধির পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন। প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, অগস্টের শেষে চিনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩.৪৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ৩.৪০০ ট্রিলিয়ন ডলারে।
অর্থাৎ, এক মাসে রিজার্ভের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ৯৬ টাকা ধরে হিসাব করলে এই অঙ্ক প্রায় ৩.৬৫ লক্ষ কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, চিন কি ডলার বিক্রি করে সোনা কিনছে? তবে দুটি পরিসংখ্যান একই সময়ে পরিবর্তিত হলেও, তার মানেই এই নয় যে ডলারের রিজার্ভ কমার সম্পূর্ণ কারণ সোনা কেনা।
কেন সোনার মজুত বাড়াচ্ছে চিন?
সোনার মজুত বাড়ানোর পিছনে কয়েকটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।
ডলারের উপর নির্ভরতা কমানো: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সোনার মজুত বাড়ালে কোনও দেশের রিজার্ভে ডলারের পাশাপাশি অন্য সম্পদের অংশও বৃদ্ধি পায়। এতে একটি নির্দিষ্ট মুদ্রার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আর্থিক অনিশ্চয়তার মোকাবিলা: আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে সোনাকে অনেক বিনিয়োগকারী তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলিও নিজেদের রিজার্ভের অংশ হিসেবে সোনা ধরে রাখে।
রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা: বৈদেশিক মুদ্রা, সরকারি বন্ড এবং সোনার মতো বিভিন্ন সম্পদে রিজার্ভ ভাগ করে রাখলে একটি নির্দিষ্ট সম্পদের দামের ওঠানামার উপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব। চিনের সোনা কেনার ধারাবাহিকতা এই ধরনের কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা: সোনা কোনও একটি দেশের মুদ্রার দায় নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি সোনা মজুত করতে পারে।
তবে চিনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ঠিক কোন উদ্দেশ্যে কতটা সোনা কিনছে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে হলে তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ডলারের রিজার্ভ কমলেই কি সোনা কেনার জন্য টাকা খরচ হয়েছে?
এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অঙ্ক কমে যাওয়ার অর্থ সব সময় এই নয় যে কোনও দেশ সেই পরিমাণ ডলার খরচ করেছে।
একটি দেশের রিজার্ভের মূল্য নির্ভর করে সেখানে থাকা বিভিন্ন মুদ্রা ও আর্থিক সম্পদের উপর। ডলারের তুলনায় অন্য মুদ্রার বিনিময়মূল্য পরিবর্তিত হলে, কিংবা রিজার্ভে থাকা বন্ড ও অন্যান্য সম্পদের বাজারদর ওঠানামা করলে মোট রিজার্ভের হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে চিনের রিজার্ভে যুক্ত হওয়া সোনার আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ৩.০৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। দুটি অঙ্কের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
তাই শুধু এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বলা যায় না যে চিনের ডলারের রিজার্ভের পতনের পুরোটা সোনা কেনার জন্য হয়েছে। এর পিছনে সম্পদের মূল্যায়ন-সহ একাধিক কারণ থাকতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতে সোনার মজুত বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে চিন—এমনটাই উঠে এসেছে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে চিনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সোনার মজুত প্রায় ২৩ টন বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। তবে এই পতনের সম্পূর্ণ অর্থ সোনা কেনার জন্য খরচ হয়েছে, এমনটা বলা ঠিক নয়। আর্থিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা, রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানো—সোনা মজুতের পিছনে এগুলিই সম্ভাব্য কারণ।












