ভাদ্র সংক্রান্তি এলেই বাঙালির বাড়িতে শুরু হয় অরন্ধনের প্রস্তুতি। আগের দিন রান্না করে পরদিন সেই খাবার খাওয়ার এই ঐতিহ্যবাহী রীতিতে অনেক বাড়িতেই ইলিশ থাকে অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু এবার সেই ইলিশ নিয়েই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে গৃহস্থের কপালে। দিঘার মৎস্যজীবীদের দাবি, বর্তমানে সমুদ্র থেকে পর্যাপ্ত ইলিশ উঠছে না। ফলে রান্নাপুজোর সময় তাজা দিঘার ইলিশ পাওয়া কঠিন হতে পারে।
অরন্ধন পুজোয় ইলিশের বিশেষ গুরুত্ব
বাঙালির লোকসংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত উৎসব অরন্ধন বা রান্নাপুজো। সাধারণত ভাদ্র সংক্রান্তির আগের দিন রান্না করে রাখা হয় বিভিন্ন পদ। পরদিন সেই রান্না খাওয়ার রীতি রয়েছে।এই আয়োজনে মাছের নানা পদ থাকলেও ইলিশের উপস্থিতি বহু বাঙালি পরিবারে বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাই অরন্ধনের আগে বাজারে ইলিশের চাহিদাও বেড়ে যায়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি অন্যরকম।
দিঘার মৎস্যবন্দরে নেই পর্যাপ্ত ইলিশ
পূর্ব ভারতের অন্যতম বড় সামুদ্রিক মৎস্য নিলামকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দিঘা। মরশুমে এখানে ইলিশ-সহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের কেনাবেচা জমজমাট থাকে।কিন্তু চলতি মরশুমে ইলিশের জোগান নিয়ে হতাশ মৎস্যজীবীরা। মরশুমের শুরু থেকেই সেভাবে ইলিশের দেখা মেলেনি। অগস্টের প্রথম দিকে কয়েক দিন পরপর কয়েক টন করে ইলিশ উঠেছিল। এরপর থেকেই পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়েছে বলে দাবি মৎস্যজীবীদের।
বারবার নিম্নচাপ, সমুদ্রে যেতে বাধা
ইলিশের জোগান কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে প্রতিকূল আবহাওয়া। একের পর এক নিম্নচাপ এবং ঝোড়ো হাওয়ার কারণে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে একাধিকবার।এমনকী আবহাওয়া কিছুটা অনুকূল থাকলেও আগের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিয়মিত মাছ ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। আবার সমুদ্রে যাওয়ার সুযোগ পেলেও অনেক সময় মৎস্যজীবীদের খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।ফলে শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের জোগানও কমেছে বলে দিঘার মৎস্যজীবীদের দাবি।
এখন বাজারে যে ইলিশ, তার বেশিরভাগই স্টোরের?
দিঘা মোহনা ফিশারম্যান অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক শ্যামসুন্দর দাস জানিয়েছেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রে মাছ ধরার ক্ষেত্রে বারবার বাধা তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে মোহনা মার্কেটে যে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশিরভাগই স্টোর করা মাছ বলে তাঁর দাবি।তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অরন্ধন পুজোর সময় দিঘা থেকে তাজা ইলিশ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
অরন্ধনের আগে ইলিশের দাম বাড়ার আশঙ্কা
রান্নাপুজোর মতো অনুষ্ঠানে ইলিশের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। অথচ এই মুহূর্তে দিঘায় সরবরাহ কম। ফলে চাহিদা ও জোগানের ব্যবধান বাড়লে বাজারে ইলিশের দামও চড়তে পারে।মৎস্যপ্রেমী বাঙালির কাছে দিঘার ইলিশের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। তাই অরন্ধনের আগে যদি তাজা দিঘার ইলিশের জোগান না বাড়ে, তাহলে বাজারে থাকা মাছের উপরই বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ কি এবার অনিশ্চিত?
অরন্ধনের পরদিন রান্না করা খাবারের সঙ্গে পান্তাভাত খাওয়ার রীতিও বহু বাঙালি পরিবারে প্রচলিত। সেই আয়োজনের সঙ্গে ইলিশের নানা পদ যুক্ত হওয়ার ফলে উৎসবের মেনু আরও জমে ওঠে।কিন্তু দিঘার বর্তমান পরিস্থিতিতে এবারের অরন্ধনে তাজা ইলিশের জোগান কতটা থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে গৃহস্থদের একাংশকে হয়তো ইলিশের বিকল্প ভাবতে হতে পারে, অথবা বাজারে পাওয়া মাছের জন্য বাড়তি দাম গুনতে হতে পারে।
ভাদ্র সংক্রান্তি উপলক্ষে বাঙালির ঘরে ঘরে পালিত হবে অরন্ধন বা রান্নাপুজো। এই লোকাচারের সঙ্গে ইলিশের বিশেষ যোগ রয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালে দিঘায় ইলিশের জোগান কার্যত তলানিতে। বারবার নিম্নচাপ, খারাপ আবহাওয়া এবং সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞার জেরে মৎস্যজীবীদের জালে উঠছে না পর্যাপ্ত ইলিশ। ফলে রান্নাপুজোর আগে দিঘার ইলিশ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।










