জলপাইগুড়ি: জন্মাষ্টমীর আবহ কাটতে না কাটতেই ঢাকের শব্দে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতির বার্তা পৌঁছে গেল জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে। শনিবার রাজবাড়ির ৫১৭ বছরের প্রাচীন দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে অনুষ্ঠিত হল দেবীর কাঠামো পুজো। আর সেই আয়োজনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল বহু বছরের পুরনো ‘কাঁদো খেলা’। কাদা মাখা মাঠ, পিচ্ছিল বাঁশ এবং চূড়ায় লুকনো নগদ পুরস্কার—সব মিলিয়ে জমে উঠল ব্যতিক্রমী এই লোকাচার।
৫১৭ বছরের পুজোয় এখনও অমলিন ঐতিহ্য
বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস দীর্ঘ ৫১৭ বছরের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নানা রীতি ও আচার মেনে এখানে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শনিবার শাস্ত্রীয় বিধি মেনে সম্পন্ন হয় কাঠামো পুজো।ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খধ্বনি এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে রাজবাড়ির পরিবেশ এদিন থেকেই হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
পুজোর পাশাপাশি নজর কাড়ল ‘কাঁদো খেলা’
কাঠামো পুজোর পাশাপাশি এদিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল রাজবাড়ির বহু পুরনো লোকাচার ‘কাঁদো খেলা’। স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই খেলায় বয়সের কোনও নির্দিষ্ট বাধা নেই। ছোট থেকে প্রবীণ—বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই আয়োজনে অংশ নেন।জন্মাষ্টমীর মাখন হাঁড়ি ভাঙার উৎসবের সঙ্গে এই লোকাচারের কিছুটা মিল রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে মনে করা হয়। তবে বৈকুণ্ঠপুরের কাঁদো খেলার নিজস্ব নিয়ম ও রোমাঞ্চই একে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
বাঁশের চূড়ায় লুকনো থাকে ৫০১ টাকা
খেলার আসল উত্তেজনা শুরু হয় একটি লম্বা বাঁশকে ঘিরে। কাঁদো খেলার মাঠের পাশে দাঁড় করানো হয় বিশাল বাঁশ। তার একেবারে মাথায় আগে থেকেই বেঁধে রাখা হয় একটি পুঁটলি।
আর সেই পুঁটলির ভিতরেই থাকে নগদ ৫০১ টাকা।
প্রতিযোগীদের লক্ষ্য একটাই—কাদায় ভরা পিচ্ছিল পরিবেশের মধ্যে সেই লম্বা বাঁশ বেয়ে দ্রুত উপরে উঠে পুঁটলিটি নামিয়ে আনা। কাজটা শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটাই কঠিন। বাঁশে ওঠার সময় ভারসাম্য ধরে রাখাই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ।
কাদায় মাখামাখি হয় প্রতিযোগীদের শরীর
খেলার নামের মতোই কাদা এই আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাদামাখা ও পিচ্ছিল শরীর নিয়ে বাঁশে ওঠার চেষ্টা করেন প্রতিযোগীরা। বারবার পিছলে পড়েও ফের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলে।কেউ মাঝপথে থেমে যান, আবার কেউ সমস্ত বাধা পেরিয়ে বাঁশের একেবারে চূড়ায় পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। দর্শকদের উচ্ছ্বাস ও চিৎকারে খেলার মাঠের পরিবেশ হয়ে ওঠে টানটান উত্তেজনায় ভরা।যিনি সবার আগে পুঁটলি নামিয়ে আনতে পারেন, তিনিই জয়ী হন এবং পান ৫০১ টাকা নগদ পুরস্কার।
কাঁদোর মাটির সঙ্গেও জড়িয়ে ধর্মীয় তাৎপর্য
এই লোকাচারের সঙ্গে শুধু বিনোদন নয়, জড়িয়ে রয়েছে দুর্গাপুজোর ধর্মীয় বিশ্বাসও। রাজবাড়ির পুরোহিত শিবু ঘোষালের বক্তব্য অনুযায়ী, কাঁদো খেলা শেষ হওয়ার পর ওই মাঠের কাদা-মাটি সংগ্রহ করে রাখা হয়।পরবর্তীতে নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধি মেনে সেই মাটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। মৃৎশিল্পীরা রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমার জন্য ব্যবহৃত মাটির সঙ্গে এই কাদা মিশিয়ে দেন।অর্থাৎ, কাঁদো খেলার এই লোকাচার পরোক্ষভাবে রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত।
খিচুড়ি ভোগে শেষ হল আয়োজন
শনিবারের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে রাজবাড়ি চত্বরে ভিড় করেন বহু ভক্ত ও দর্শনার্থী। কাঠামো পুজো এবং কাঁদো খেলা ঘিরে উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয় রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী প্রসাদী খিচুড়ি ভোগ।
আধুনিকতার মাঝেও বেঁচে রয়েছে পুরনো লোকাচার
সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রাও। কিন্তু বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির মতো ঐতিহাসিক পুজোয় এখনও ধরে রাখা হয়েছে বহু পুরনো আচার ও লোকসংস্কৃতি। কাঁদো খেলা তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।ধর্মীয় আচার, লোকখেলা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ—এই তিনের মেলবন্ধনে বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো আজও উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির একটি বিশেষ পরিচয় বহন করে।
জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে ৫১৭ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল ঐতিহ্য মেনে। শনিবার শাস্ত্রীয় নিয়মে সম্পন্ন হয়েছে দেবীর কাঠামো পুজো। তবে দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শতবর্ষের পুরনো লোকাচার ‘কাঁদো খেলা’। কাদায় মাখামাখি শরীরে পিচ্ছিল লম্বা বাঁশ বেয়ে উঠে তার মাথায় লুকিয়ে রাখা পুঁটলি নামিয়ে আনতে হয় প্রতিযোগীদের। সেই পুঁটলির ভিতর থাকে ৫০১ টাকা নগদ পুরস্কার।











