উত্তর ২৪ পরগনা: সুন্দরবন মানেই ম্যানগ্রোভ অরণ্য, নদী-খাঁড়ি আর বিচিত্র জলজ প্রাণের সমাহার। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় দেশি মাছ। কিন্তু বদলে যাচ্ছে সেই পরিচিত জলজ পরিবেশ। দূষণ থেকে লবণাক্ততার পরিবর্তন—একাধিক কারণে সুন্দরবনের নদী ও জলাভূমিতে কমছে বহু দেশি মাছের উপস্থিতি। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া না গেলে পরিচিত বেশ কিছু মাছ ভবিষ্যতে শুধুই স্মৃতির অংশ হয়ে যেতে পারে।
একসময় যে মাছ ছিল ঘরে ঘরে
সুন্দরবনের জলভাগে আগে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ সহজেই পাওয়া যেত। চাঁদা আমলেট, কাক্কই, গড়ুই, তেলটুপি ও পাথরকাটা-র মতো মাছ স্থানীয় জলজ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।শুধু নদী বা খাঁড়ির বাস্তুতন্ত্রেই নয়, স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকাতেও এই মাছগুলির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। কিন্তু নদীর পরিবেশ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বহু প্রজাতির মাছের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ও প্রজননক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে।
বিদ্যাধরী নদীর দূষণ নিয়ে উদ্বেগ
সুন্দরবনের দেশি মাছের সংকটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে জলদূষণ। অভিযোগ, কলকাতা ও আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য, রাসায়নিক পদার্থ ও প্লাস্টিক বিদ্যাধরী নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনের জলভাগে পৌঁছচ্ছে।এর প্রভাব পড়ছে জলজ পরিবেশের উপর। বিভিন্ন গবেষণায় মাছের শরীরে, বিশেষ করে তাদের পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের বিষয় সামনে এসেছে।জলজ প্রাণীর শরীরে এই দূষণ জমতে থাকলে তা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের কাছেও পৌঁছতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
আয়লার পর বদলেছে লবণাক্ততার চরিত্র
সুন্দরবনের পরিবেশে জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০০৯ সালের আয়লার পর সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় লবণাক্ততার পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।এর পাশাপাশি সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো পরিবেশগত পরিবর্তনও নদী ও মোহনার জলজ বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করছে। ফলে তুলনামূলক কম লবণাক্ত জলে বসবাসকারী পাবদা, ট্যাঙরা, খলসে-র মতো মাছের উপযুক্ত পরিবেশ অনেক জায়গাতেই কমে যাচ্ছে।প্রজননের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি না থাকায় স্বাভাবিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
পলি জমে বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ
শুধু দূষণ বা লবণাক্ততাই নয়, সুন্দরবনের নদী-খাঁড়ির স্বাভাবিক চরিত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কোথাও অতিরিক্ত পলি জমছে, আবার কোথাও পলি তোলা বা খাল ভরাটের মতো কর্মকাণ্ডের ফলে জলপথের গভীরতা ও প্রবাহের ধরন বদলে যাচ্ছে।মাছের প্রজনন ও বিচরণের ক্ষেত্রে অগভীর জল, জলজ উদ্ভিদ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে সদ্য জন্মানো মাছ ও ছোট প্রজাতির জন্য এই পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।নদীর জলস্তরের দ্রুত পরিবর্তন বা জলপথের চরিত্র বদলে গেলে সেই প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থলও নষ্ট হয়। ফলে মাছের জীবনচক্রে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
ভুটভুটি চলাচল নিয়েও প্রশ্ন
সুন্দরবনের নদীপথে অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সুন্দরবন বিষয়ক গবেষক অনিমেষ মণ্ডল জানিয়েছেন, কলকাতার বর্জ্য ও দূষিত জল বিদ্যাধরী নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে পৌঁছে জলজ প্রাণীদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নদীতে অতিরিক্ত ভুটভুটি চলাচলও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। নৌযানের ইঞ্জিনের শব্দ, জ্বালানি এবং অন্যান্য দূষণের কারণে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে মাছের বিচরণ ও বিস্তারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু মাছ নয়, সংকটে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য
দেশি মাছের সংখ্যা কমে যাওয়া শুধুমাত্র স্থানীয় মানুষের খাদ্যাভ্যাসে প্রভাব ফেলবে—বিষয়টি এতটা সরল নয়। মাছ সুন্দরবনের জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে কোনও একটি প্রজাতির সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব অন্য জলজ প্রাণী ও গোটা বাস্তুতন্ত্রের উপর পড়তে পারে।একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের খাদ্যসংস্কৃতি ও নদীনির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে এই মাছগুলি। ফলে প্রজাতি হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি অঞ্চলের পরিচিত স্বাদ ও ঐতিহ্যের অংশও।
একাধিক চাপ একসঙ্গে বাড়াচ্ছে বিপদ
সুন্দরবনের দেশি মাছের উপর একসঙ্গে একাধিক পরিবেশগত চাপ তৈরি হয়েছে। জলদূষণ, প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক, লবণাক্ততার পরিবর্তন, জলবায়ুগত পরিবর্তন, পলি জমা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ এবং অনিয়ন্ত্রিত নৌযান ও পর্যটন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।প্রাকৃতিক আবাসস্থল এবং প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষিত রাখা না গেলে ভবিষ্যতে স্থানীয় বহু মাছের সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুন্দরবনের নদী, খাঁড়ি ও জলাভূমিতে একসময় প্রচুর দেখা যেত নানা ধরনের দেশি মাছ। চাঁদা আমলেট, কাক্কই, গড়ুই, তেলটুপি, পাথরকাটার মতো স্থানীয় প্রজাতি এখন পরিবেশগত নানা পরিবর্তনের চাপে অস্তিত্বের সংকটে। জলদূষণ, মাইক্রোপ্লাস্টিক, লবণাক্ততার পরিবর্তন, পলি জমা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ এবং অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল—সব মিলিয়ে সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্র নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।











