একদিকে বাস্তব জীবনের নানা অনুভূতি ও সম্পর্ককে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরেছেন তিনি, অন্যদিকে তাঁর নিজের জীবনও বারবার সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে। একসময় সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে পথচলা শুরু করে পরে পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করেন মহেশ ভাট। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে প্রেম, বিয়ে, বিচ্ছিন্নতা এবং নতুন সম্পর্ক। সেই সঙ্গে রয়েছে এমন কিছু ঘটনা, যা তাঁকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি করেছিল।

ছোটবেলা থেকেই ছিল নানা প্রতিকূলতা
মহেশ ভাটের বাবা নানাভাই ভাট ছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক। তাঁর মা শিরিন মোহাম্মদ আলির সঙ্গে নানাভাইয়ের বিয়ে হয়নি। ফলে ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক পরিস্থিতি ও সামাজিক মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল মহেশকে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।পরিবারের আর্থিক অবস্থাও খুব স্বচ্ছল ছিল না। এই অভিজ্ঞতাগুলি পরবর্তী সময়ে তাঁর চিন্তাভাবনা ও চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুর উপর প্রভাব ফেলেছিল বলে তাঁর জীবন নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
মেহবুব স্টুডিও থেকে শুরু পথচলা
সিনেমার প্রতি আগ্রহ থেকেই মহেশ ভাট চলচ্চিত্র জগতে কাজ খুঁজতে শুরু করেন। মেহবুব স্টুডিওতে গিয়ে কাজ পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে পরিচালক রাজ খোসলার সঙ্গে পরিচয় আছে বলে দাবি করেছিলেন মহেশ। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সত্যি কথা স্বীকার করেন। তাঁর সততায় খুশি হয়ে রাজ খোসলা তাঁকে নিজের দলের সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ দেন। এভাবেই চলচ্চিত্র জগতে তাঁর পেশাগত যাত্রা শুরু হয়।
১৯৭৪ সালে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
মহেশ ভাট ১৯৭৪ সালে ‘মঞ্জিলেঁ অউর ভি হ্যায়’ ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর সিনেমায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক এবং সমাজের নানা বাস্তব দিকের ছাপ দেখা যেত।এরপর ‘আর্থ’, ‘সারাংশ’, ‘নাম’, ‘আওয়ারগি’ এবং ‘কাশমাকাশ’-এর মতো ছবি পরিচালনা করেন তিনি। বিশেষ করে ১৯৮৪ সালের ‘সারাংশ’ তাঁকে পরিচালকদের মধ্যে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।

‘আশিকি’ বদলে দেয় জনপ্রিয়তার সমীকরণ
১৯৯০ সালে মুক্তি পায় ‘আশিকি’। ছবির প্রেমের গল্পের পাশাপাশি এর গানও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। এই ছবির পর মহেশ ভাট আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রযোজনা সংস্থা বিশেষ ফিল্মস। এই ব্যানারের অধীনে ‘রাজ’, ‘মার্ডার’, ‘জিসম’, ‘জান্নাত’ এবং ‘আশিকি ২’-এর মতো ছবি তৈরি হয়।
‘জখম’ এনে দেয় জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি
মহেশ ভাটের পরিচালিত ‘জখম’ তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি। ১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি পায়। ছবিটি জাতীয় সংহতির উপর শ্রেষ্ঠ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য নার্গিস দত্ত পুরস্কারও লাভ করে।‘জখম’-এর গল্পের সঙ্গে মহেশ ভাটের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু অভিজ্ঞতার যোগ রয়েছে বলেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
কলেজ জীবনের প্রেম থেকে প্রথম বিয়ে
ব্যক্তিগত জীবনে মহেশ ভাটের প্রথম বিয়ে হয়েছিল কিরণের সঙ্গে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, কিরণের আসল নাম ছিল লরিয়েন। কলেজ জীবনে তাঁদের পরিচয় হয় এবং পরবর্তীতে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়।তাঁদের বিয়ের পর লরিয়েন নাম বদলে কিরণ রাখেন। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় কন্যা পূজা ভাট। পরবর্তীকালে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পারভীন ববির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও হয়েছিল আলোচনা
মহেশ ভাটের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলির একটি ছিল অভিনেত্রী পারভীন ববি-র সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। তাঁদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সেই সময়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।কিছু প্রতিবেদনে তাঁদের একসঙ্গে থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের অনেকটাই দীর্ঘদিনের সংবাদ প্রতিবেদন ও স্মৃতিচারণের উপর নির্ভরশীল।

সোনি রাজদানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক
১৯৮৪ সালে ‘সারাংশ’-এর কাজের সময় অভিনেত্রী সোনি রাজদানের সঙ্গে মহেশ ভাটের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।তখন মহেশ ভাট প্রথম স্ত্রী কিরণের সঙ্গে বিবাহিত ছিলেন। পরবর্তীতে মহেশ ভাট ও সোনি রাজদান বিয়ে করেন। তাঁদের দুই কন্যা শাহিন ভাট এবং আলিয়া ভাটপ্রথম স্ত্রী কিরণের সঙ্গে মহেশের দুই সন্তান পূজা ভাট ও রাহুল ভাট। ফলে দুই সংসার মিলিয়ে তাঁর চার সন্তান রয়েছে।
বিতর্কের পাশাপাশি দীর্ঘ চলচ্চিত্র কেরিয়ার
মহেশ ভাটের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা সময়ে বিভিন্ন আলোচনা ও বিতর্ক থাকলেও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক ও সামাজিক বাস্তবতার মতো বিষয় তাঁর সিনেমার গল্পে বারবার ফিরে এসেছে। সেই কারণেই তাঁর জীবন ও কাজ—দুই দিকই দীর্ঘদিন ধরে দর্শক ও সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের বিষয়।

বলিউডে এমন অনেক পরিচালক রয়েছেন, যাঁদের সিনেমার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থেকেছে। মহেশ ভাট তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ‘আর্থ’, ‘সারাংশ’, ‘আশিকি’, ‘জখম’-এর মতো ছবির পরিচালক হিসেবে তাঁর পরিচিতি যেমন দীর্ঘ, তেমনই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বহু বছর ধরে নানা আলোচনা রয়েছে। দুই বিয়ে, পারভীন ববির সঙ্গে সম্পর্কের চর্চা এবং সোনি রাজদানের সঙ্গে বিবাহ—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনও যেন সিনেমার গল্পের মতোই ঘটনাবহুল।








