পাকা চুল ঢাকতে কিংবা নতুন লুক পাওয়ার জন্য হেয়ার কালারের ব্যবহার এখন অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিয়মিত চুলে রং করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণার পর আবারও আলোচনায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—হেয়ার কালারের রাসায়নিক উপাদান কি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে? চিকিৎসক ও গবেষকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা জানা প্রয়োজন প্রত্যেকের।
চুলে রং করার প্রবণতা বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্য সচেতনতা
বর্তমান সময়ে চুল পাকা আর শুধু বয়সের লক্ষণ নয়। মানসিক চাপ, দূষণ, খাদ্যাভ্যাস এবং বিভিন্ন শারীরিক কারণেও অনেকের অল্প বয়সে চুল সাদা হয়ে যাচ্ছে। ফলে হেয়ার কালারের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। বাজারে স্থায়ী (Permanent), সেমি-পার্মানেন্ট এবং অর্গানিক—বিভিন্ন ধরনের রং পাওয়া যাচ্ছে।তবে সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই পণ্যগুলির নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরীরের উপর কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কি না, তা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
কেন উদ্বেগের কেন্দ্রে হেয়ার ডাইয়ের রাসায়নিক উপাদান?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক পার্মানেন্ট হেয়ার ডাইয়ে অ্যারোমেটিক অ্যামাইন, প্যারাফেনিলেনডায়ামিন (PPD) এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা দীর্ঘদিন ধরে গবেষকদের নজরে রয়েছে।কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ধরনের রাসায়নিক শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক কার্যকলাপে প্রভাব ফেলতে পারে। যেহেতু স্তন ক্যানসারের সঙ্গে হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে, তাই হেয়ার ডাইয়ের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।
গবেষণায় কী তথ্য উঠে এসেছে?
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচালিত কয়েকটি বড় গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে হেয়ার কালার ব্যবহারকারী মহিলাদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।গবেষকদের একটি অংশের মতে, নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি পার্মানেন্ট হেয়ার ডাই ব্যবহারকারীদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি সামান্য বেশি দেখা গিয়েছে। তবে এই ঝুঁকির মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম এবং সব গবেষণায় একই ফলাফল পাওয়া যায়নি।ফলে বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন, হেয়ার কালার ও স্তন ক্যানসারের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও তা এখনও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
স্তন ক্যানসারের কারণ কি শুধুই হেয়ার কালার?
চিকিৎসকদের মতে, মোটেও নয়। স্তন ক্যানসার একটি বহুমাত্রিক রোগ। এর পিছনে জিনগত কারণ, পারিবারিক ইতিহাস, বয়স, হরমোনের পরিবর্তন, স্থূলতা, জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত নানা বিষয় একসঙ্গে কাজ করে।তাই শুধুমাত্র চুলে রং করার কারণে কারও স্তন ক্যানসার হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। বরং এটি বহু কারণের সম্মিলিত প্রভাবের ফল।
ক্যানসার ছাড়াও থাকতে পারে অন্য ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হেয়ার কালারের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হল অ্যালার্জি। অনেকের ক্ষেত্রে মাথার ত্বকে চুলকানি, জ্বালাভাব, ফুসকুড়ি বা প্রদাহ দেখা দিতে পারে।এছাড়া চোখে ডাই চলে গেলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সংবেদনশীল ত্বকের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি হতে পারে। তাই নতুন কোনও হেয়ার কালার ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করা অত্যন্ত জরুরি।
চুলে রং করার সময় কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন?
চিকিৎসক ও ত্বক বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সাধারণ পরামর্শ দিয়েছেন—
প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘন ঘন হেয়ার কালার ব্যবহার করবেন না।
ভালো মানের ও স্বীকৃত ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার করুন।
ব্যবহারের আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করুন।
গ্লাভস ব্যবহার করুন এবং নির্দেশিকা মেনে চলুন।
সম্ভব হলে কম রাসায়নিকযুক্ত বা অর্গানিক বিকল্প বেছে নিন।
মাথার ত্বকে ক্ষত বা সংক্রমণ থাকলে ডাই ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
চুলে রং করা এখন নিত্যদিনের সৌন্দর্যচর্চার অংশ। তবে দীর্ঘদিন ধরে হেয়ার কালার ব্যবহারে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে বহু মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত বলছে, কিছু ক্ষেত্রে সামান্য ঝুঁকির ইঙ্গিত মিললেও সরাসরি সম্পর্কের পক্ষে এখনও শক্তিশালী প্রমাণ নেই। তাই আতঙ্ক নয়, সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।













