শরীরের ছোটখাটো সমস্যাকে ভয়ঙ্কর রোগের উপসর্গ বলে মনে হওয়া, বারবার ডাক্তার বদলানো কিংবা Google-এ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোগের লক্ষণ খোঁজা— এসব অভ্যাসকে অনেকেই সাধারণ দুশ্চিন্তা বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু মনোবিদদের মতে, এর পিছনে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যার নাম ইলনেস অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা হাইপোকন্ড্রিয়া।
সামান্য উপসর্গেই বড় রোগের ভয়, কী এই হাইপোকন্ড্রিয়া?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হাইপোকন্ড্রিয়া বা ইলনেস অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি সবসময় আশঙ্কা করেন যে তিনি কোনও গুরুতর রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসকের রিপোর্ট স্বাভাবিক এলেও সেই ভয় কাটে না। বরং শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন বা সাধারণ অসুস্থতাকেও প্রাণঘাতী রোগের লক্ষণ বলে মনে হতে থাকে।
কেন বারবার Google Search করেন অনেকে?
এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা হল ‘সাইবারকন্ড্রিয়া’। অর্থাৎ সামান্য কোনও উপসর্গ দেখা দিলেই ইন্টারনেটে রোগের লক্ষণ খুঁজতে শুরু করা। মাথাব্যথা থেকে শুরু করে বুক ধড়ফড়— সব কিছুর সঙ্গেই তারা ক্যানসার, হার্ট অ্যাটাক বা অন্য গুরুতর রোগের সম্পর্ক খুঁজতে থাকেন।ফলে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় এবং একটি দুশ্চিন্তার চক্র তৈরি হয়, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?
মনোবিদদের মতে, যাঁরা আগে কোনও গুরুতর অসুস্থতার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন অথবা পরিবারের কাউকে বড় রোগে হারিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে এই সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেশি।এছাড়া অতিরিক্ত চিন্তাশীল, উদ্বেগপ্রবণ বা ওভারথিঙ্কিং-এর স্বভাব যাঁদের রয়েছে, তাঁদের মধ্যেও এই ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?
বারবার রোগের লক্ষণ খোঁজা
প্রতিদিন বা প্রায়ই ইন্টারনেটে রোগ সংক্রান্ত তথ্য খুঁজে দেখা।
ঘন ঘন ডাক্তার বদলানো
একজন চিকিৎসকের পরামর্শে আশ্বস্ত না হয়ে বারবার নতুন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।
রিপোর্ট স্বাভাবিক হলেও ভয় না কাটা
সব পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক আসার পরেও মনে হওয়া যে শরীরে নিশ্চয়ই কোনও গুরুতর রোগ রয়েছে।
মৃত্যুভয় ও অতিরিক্ত উদ্বেগ
ছোটখাটো শারীরিক অস্বস্তিকেও প্রাণঘাতী পরিস্থিতি বলে মনে হওয়া।
কীভাবে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার চিকিৎসা সম্ভব। প্রথমেই প্রয়োজন সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা। এরপর কাউন্সেলিং, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) এবং প্রয়োজন হলে ওষুধের সাহায্যে ধীরে ধীরে উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।রোগীকে বোঝানো হয় যে, সব শারীরিক উপসর্গ গুরুতর রোগের ইঙ্গিত নয় এবং অতিরিক্ত ভয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
মনোবিদদের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য জানার জন্য সবসময় ইন্টারনেটের উপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অকারণে Google Search, বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা চিকিৎসক পরিবর্তনের প্রবণতা কমাতে হবে।মনে রাখতে হবে, শরীরে ছোটখাটো সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক। প্রতিটি উপসর্গকে বড় রোগের সংকেত হিসেবে ভাবলে মানসিক চাপ আরও বাড়বে।
সামান্য মাথাব্যথা, দুর্বলতা কিংবা শরীরের ছোটখাটো অস্বস্তিকেও যদি বারবার মারাত্মক অসুখের ইঙ্গিত বলে মনে হয়, আর সেই কারণেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা Google-এ লক্ষণ খুঁজে বেড়ান, তাহলে বিষয়টি শুধু দুশ্চিন্তা নয়। মনোবিদদের মতে, এটি ইলনেস অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (Illness Anxiety Disorder) বা হাইপোকন্ড্রিয়া-র একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। এই অবস্থায় মানুষ প্রায়ই স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনকেও গুরুতর রোগের সংকেত বলে ধরে নেন। ফলে উদ্বেগ বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যা ব্যক্তিগত জীবন, কাজকর্ম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তাই অকারণ আতঙ্কে না ভুগে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।













