ভারত যখন ‘উন্নত রাষ্ট্র’-এর পথে এগোচ্ছে, তখন সেই যাত্রায় পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এই বার্তাকেই সামনে রেখে রাজ্যে রেল উন্নয়নের গতি বাড়াতে উদ্যোগী কেন্দ্র। ব্যস্ত রুটে ট্রেন চলাচল বাড়ানো থেকে শুরু করে স্টেশন আধুনিকীকরণ—সব মিলিয়ে বাংলাকে রেল মানচিত্রে নতুন করে গুরুত্ব দিতে চাইছে ভারতীয় রেল।
বাংলার কৌশলগত গুরুত্ব ও রেলের ভূমিকা
পূর্ব ভারত, উত্তর-পূর্ব এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ একটি স্বাভাবিক প্রবেশদ্বার। কেন্দ্রের দাবি, এই ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে কাজে লাগাতেই ২০১৪ সালের পর থেকে রাজ্যে রেল পরিকাঠামো সম্প্রসারণে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনগুণ বেড়েছে রেল বাজেট
২০০৯-১৪ সময়কালে যেখানে পশ্চিমবঙ্গের জন্য গড় বার্ষিক রেল বাজেট ছিল ৪,৩৮০ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৪ সালের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩,৯৫৫ কোটিতে। বর্তমানে রাজ্যজুড়ে ৮৭,৮৬২ কোটিরও বেশি টাকার রেল প্রকল্প চলছে বলে রেল সূত্রের দাবি।
নতুন লাইন ও আন্তর্জাতিক সংযোগ
২০১৪ সালের পর পশ্চিমবঙ্গে ১,৩৬২ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ হয়েছে। মন্দার হিল-রামপুরহাট নতুন লাইন বীরভূমে যোগাযোগে গতি এনেছে, অন্যদিকে হলদিবাড়ি আন্তর্জাতিক সীমান্ত লাইন বাংলাদেশ-সংযোগকে আরও মজবুত করেছে।
ডাবলিং ও তৃতীয় লাইনে স্বস্তি
পাঁশকুড়া-খড়গপুর, লালগোলা-জিয়াগঞ্জ, কৃষ্ণনগর-বেথুয়াডহরি, নিউ কোচবিহার-গুমনিহাটের মতো ব্যস্ত রুটে ডাবলিং ও তৃতীয় লাইন চালু হওয়ায় শহরতলি ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলে স্বস্তি মিলেছে।
গেজ রূপান্তরে দ্রুত গতি
বর্ধমান-কাটোয়া, আহমেদপুর-কাটোয়া ও নিউ মাল জংশন-চ্যাংরাবান্ধা গেজ রূপান্তর প্রকল্প রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংযোগকে আরও মসৃণ করেছে, যার ফলে দ্রুতগতির ট্রেন চালানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পে নতুন চেহারা
‘অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্প’-এর অধীনে পশ্চিমবঙ্গের ১০১টি স্টেশন পুনর্গঠনের জন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৩,৬০০ কোটি টাকা। পানাগড়, জয়চণ্ডী পাহাড় ও কল্যাণী ঘোষপাড়া স্টেশন ইতিমধ্যেই নতুন রূপে যাত্রীদের সামনে এসেছে।
জমি অধিগ্রহণে আটকে বহু প্রকল্প
তবে চিত্রের অন্য দিকও রয়েছে। জমি অধিগ্রহণ ও রাজ্য স্তরের অনুমোদন সমস্যার কারণে কলকাতা ও তার আশপাশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ডাবলিং ও নতুন লাইন প্রকল্প থমকে আছে। হাওড়া-আমতা-বাগনান, নিউ আলিপুর-আকরা ও সোনারপুর-ক্যানিং প্রকল্প তার উদাহরণ।
৫০টির বেশি নতুন লাইন অনিশ্চিত
তারকেশ্বর-মগরা, আরামবাগ-চাঁপাডাঙ্গা, জয়নগর-দুর্গাপুর, ডায়মন্ড হারবার-বহরাহাটসহ ৫০টিরও বেশি নতুন লাইন প্রকল্প জমি সংক্রান্ত জটিলতায় আটকে রয়েছে বলে রেল সূত্রে জানা গেছে।
কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ই মূল চাবিকাঠি
রেলের এক শীর্ষ আধিকারিকের মতে, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য একসঙ্গে কাজ করেছে, সেখানে প্রকল্প দ্রুত এগিয়েছে। সমন্বয়ের অভাবেই বহু সম্পূর্ণ অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
পশ্চিমবঙ্গে রেল পরিকাঠামো উন্নয়নে বড়সড় বিনিয়োগ করেছে কেন্দ্র। নতুন রেললাইন, ডাবলিং-তৃতীয় লাইন, গেজ রূপান্তর ও ‘অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। যদিও জমি অধিগ্রহণ ও রাজ্য স্তরের সমন্বয় ঘাটতির কারণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখনও থমকে রয়েছে।









