কলকাতার কেবিন-সংস্কৃতির অন্যতম জনপ্রিয় পদ ফিশ কবিরাজি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, মাছের উপর যেন ডিমের তৈরি পাতলা জালের চাদর জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কামড় বসাতেই সেই আস্তরণে মেলে মুচমুচে স্বাদ, আর ভিতরে থাকে নরম মশলাদার মাছ। রেস্তোরাঁয় গিয়ে এই পদ খেতে ভালোবাসেন অনেকেই। তবে সঠিক পদ্ধতি জানা থাকলে বাড়িতেও বানানো সম্ভব। বিশেষ করে ডিমের জাফরি তৈরি করাটাই এই রান্নার আসল কৌশল।

‘কবিরাজি’ নামটা এল কোথা থেকে?
ফিশ কবিরাজির সঙ্গে আয়ুর্বেদের ‘কবিরাজ’ শব্দের সরাসরি সম্পর্ক নেই। প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই পদের নামের সঙ্গে ইংরেজি ‘কভারেজ’ শব্দের যোগ রয়েছে। মাছকে ডিমের বিশেষ আস্তরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পদ্ধতি থেকেই ‘ফিশ কভারেজ’ বা ‘কবিরাজি’ নামটির প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয়।পদের উপর তৈরি ডিমের পাতলা জালই আসলে এর পরিচিত বৈশিষ্ট্য। সেই কভারেজে মাছকে মুড়ে ভেজে নেওয়া হয়।
প্রথমে মাছের ফিলে তৈরি করুন
ফিশ কবিরাজি বানানোর প্রথম ধাপ অনেকটা ফিশ ফ্রাইয়ের মতো। পছন্দের মাছের ফিলে নিয়ে প্রয়োজনমতো নুন-মশলা দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখুন।এরপর ফিলেগুলিকে পাতলা ব্রেডক্রাম্বের আস্তরণে মুড়ে নিন। এই ধাপে ডিমের কোটিং ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ পরে আলাদা করে ডিমের কভারেজ তৈরি করা হবে।এবার গরম ডুবো তেলে ফিলেগুলিকে মাঝারি থেকে একটু বেশি আঁচে ভেজে নিন। প্রথম দফায় মাছ পুরোপুরি বাদামি করে না ভেজে প্রয়োজনমতো সেদ্ধ ও হালকা ক্রিস্পি করে তুলে রাখুন।
এবার আসল কভারেজের প্রস্তুতি
ফিশ কবিরাজির প্রাণ হল ডিমের কভারেজ। এর জন্য কাঁচালঙ্কা, নুন এবং গোলমরিচ থেঁতো করে একটি মশলা তৈরি করতে পারেন।প্রায় ১০ গ্রাম কাঁচালঙ্কা, আধ চামচ নুন এবং ১০টি গোলমরিচ থেঁতো করে নিন। এর মধ্যে থেকে অল্প পরিমাণ মশলা নিয়ে চারটি ডিমের সঙ্গে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। ফেটানো ডিম কিছুক্ষণ রেখে দিন।এরপর আলাদা করে ৮ গ্রাম করে ময়দা ও কর্নফ্লাওয়ার নিয়ে তার সঙ্গে কয়েক চামচ ফেটানো ডিম মিশিয়ে ঘন মিশ্রণ তৈরি করুন।

ডিমে সরাসরি ময়দা দেবেন না
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল রয়েছে। ময়দা বা কর্নফ্লাওয়ার সরাসরি অনেকটা ডিমের মধ্যে ঢেলে দিলে দলা তৈরি হতে পারে। তাই অল্প ডিমের সঙ্গে আগে ময়দা-কর্নফ্লাওয়ার মিশিয়ে মসৃণ মিশ্রণ তৈরি করুন।তারপর সেই মিশ্রণটি বাকি ফেটানো ডিমের সঙ্গে মিশিয়ে নিন। এতে কভারেজের ব্যাটার তুলনামূলকভাবে মসৃণ হবে।
কীভাবে তৈরি করবেন ডিমের জাফরি?
এবার একটি বড় ও গভীর কড়াইয়ে পর্যাপ্ত তেল গরম করুন। তেল যথেষ্ট গরম হলে চার আঙুলের সাহায্যে ডিমের মিশ্রণ তুলে তেলের উপর দ্রুত ছড়িয়ে দিন।বুড়ো আঙুল বাদ দিয়ে চার আঙুল ব্যাটারে ডুবিয়ে, আঙুল সোজা রেখে তেলের উপর হালকা হাতে ডিমের গোলা ছড়াতে থাকুন।খেয়াল রাখতে হবে, ডিমের মিশ্রণ যেন এক জায়গায় জমাট না হয়ে যায়। হাতের নড়াচড়ায় তেলের উপর তৈরি হবে পাতলা, জালকাটা বা জাফরির মতো একটি আস্তরণ।
জাফরি বেশি পুরু করবেন না
ফিশ কবিরাজির সৌন্দর্য এবং মুচমুচে ভাব অনেকটাই নির্ভর করে এই কভারেজের উপর। তাই ডিমের স্তর খুব মোটা করে ফেললে কাঙ্ক্ষিত জাফরি-জাল তৈরি হবে না।ডিমের জাল যখন হালকা বাদামি রং ধরতে শুরু করবে, তখন উপর থেকে সামান্য ধনেপাতা কুচি ও জোয়ান ছড়িয়ে দিতে পারেন।

এবার মাছকে জাফরির মধ্যে মুড়ে দিন
আগে ভেজে রাখা মাছের ফিলেগুলি আরও একবার ফেটানো ডিমে চুবিয়ে নিন। এবার তেলে তৈরি ডিমের জাফরির উপর মাছের ফিলে রেখে দিন।ধীরে ধীরে সেই ডিমের আস্তরণ দিয়ে মাছটিকে চারদিক থেকে মুড়ে দিন। এই বিশেষ কভারেজই ফিশ কবিরাজিকে সাধারণ ফিশ ফ্রাইয়ের থেকে আলাদা করে।মাছটি ভালোভাবে জড়িয়ে গেলে গরম তেলে এপিঠ-ওপিঠ ভেজে নিন। বাইরের ডিমের জাফরি সুন্দর বাদামি ও মুচমুচে হয়ে এলে তুলে নিন।

বাড়তি তেল ঝরিয়ে পরিবেশন
ভাজার পর ফিশ কবিরাজি সরাসরি প্লেটে না দিয়ে কিছুক্ষণ টিস্যু বা কিচেন ন্যাপকিনের উপর রাখতে পারেন। এতে অতিরিক্ত তেল কিছুটা শুষে যাবে।এরপর গরমাগরম পরিবেশন করুন কাসুন্দি বা পছন্দের সসের সঙ্গে। বাইরে মুচমুচে ডিমের জাফরি আর ভিতরে নরম মাছ—বিকেলের আড্ডায় জমে যাবে কলকাতার এই চেনা স্বাদ।
কলকাতার চপ-কাটলেটের জগতে ফিশ কবিরাজির আলাদা জনপ্রিয়তা রয়েছে। মাছের ফিলের উপর মুচমুচে ডিমের জাফরির আস্তরণই এই পদের বিশেষত্ব। একটু কৌশল জানলেই বাড়ির রান্নাঘরেই তৈরি করা যায় এই জনপ্রিয় পদ। জেনে নিন ফিশ কবিরাজির রেসিপি এবং ‘কবিরাজি’ নামের নেপথ্যের গল্প।








