ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবার জয়ী লুলা দা সিলভা

ব্রাজিলের ২০২৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৫১.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তাঁর নতুন কার্যকাল শুরু হবে ৫ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে।

ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় দক্ষিণপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন ৮০ বছর বয়সি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর, রবিবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলা পেয়েছেন প্রায় ৫১.৮ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে, ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২ শতাংশ ভোট। এই জয়ের ফলে চতুর্থবারের জন্য ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব গ্রহণ করতে চলেছেন লুলা। তাঁর নতুন কার্যকালের মেয়াদ শুরু হবে ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে।

৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রথম দফায় ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছিলেন ৪৭.০৩ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে, ৪৫.১৬ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন লুলা। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ২২ লক্ষ।

তবে দ্বিতীয় দফার ভোটে সেই ব্যবধান অতিক্রম করে প্রায় ৪৪ লক্ষ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন লুলা। ১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও কোনও প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ের ঘটনা এই প্রথম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রাজিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দুই দফায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফায় কোনও প্রার্থী বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি না পেলে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় দফার ভোট হয়।

দ্বিতীয় দফার আগে তরুণ ভোটার, দরিদ্র পরিবার এবং পুরনো সমর্থকদের কাছে পৌঁছতে প্রচার জোরদার করেন লুলা। প্রথম দফায় ২১.০৮ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে আসেননি। দ্বিতীয় দফায় অনুপস্থিত ভোটারের হার কমে দাঁড়ায় ১৯.২১ শতাংশে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে পাওয়া সমর্থনও লুলার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জাইর বলসোনারোর ছেলে। ২০২২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করেছিলেন লুলা। সেই নির্বাচনে লুলা পেয়েছিলেন ৫০.৯০ শতাংশ ভোট এবং জাইর বলসোনারো পেয়েছিলেন ৪৯.১০ শতাংশ ভোট।

বলসোনারো পরিবারকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই কারণে ব্রাজিলের এই নির্বাচনের দিকে আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশের নজর ছিল। নির্বাচনী প্রচারে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন বিদেশনীতি নিয়ে গুরুত্ব দেন লুলা।

লুলার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ২০০২ সালে প্রথমবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। ২০০৬ সালেও পুনরায় জয়লাভ করেন। পরপর দুই কার্যকালের মেয়াদ সম্পূর্ণ করার পর ২০১০ সালে রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়েন লুলা।

ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবার জয়ী লুলা দা সিলভা

২০১৮ সালে দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলায় তাঁকে কারাবন্দি হতে হয়। পরবর্তী সময়ে আদালত তাঁর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বাতিল করে। এরপর ২০২২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণের সময়সীমা বাড়ানো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ঠিক আগে সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি কয়েকটি কেন্দ্রে অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা ভোটগ্রহণের অনুমতি দেন।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ফ্লাভিও বলসোনারো। তিনি নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন এবং ভোট বাতিলের দাবিও জানিয়েছেন। তবে ব্রাজিলের নির্বাচন কর্তৃপক্ষ লুলার জয় নিশ্চিত করেছে।

নির্বাচনী প্রচারে মূল্যবৃদ্ধির চাপে থাকা পরিবার এবং শ্রমিকদের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন লুলা। নির্বাচনের আগে তাঁর সরকার দরিদ্র পরিবারগুলির জন্য চালু থাকা বলসা ফ্যামিলিয়া প্রকল্পের আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ১৫ শতাংশ বাড়িয়েছিল।

এ ছাড়া সপ্তাহান্তে গণপরিবহণ বিনামূল্যে করা এবং ঋণের চাপে থাকা পরিবারগুলিকে সহায়তা দেওয়ার মতো কর্মসূচিও সামনে আনা হয়েছিল। তবে বিনামূল্যে গণপরিবহণের মতো ঘোষণাগুলি বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত বাজেট এবং রাজনৈতিক সমর্থনের প্রয়োজন হবে।

চতুর্থ কার্যকালে লুলার সামনে একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ব্রাজিলের সংসদে দক্ষিণপন্থী দলগুলির প্রভাব বেড়েছে। ফ্লাভিও বলসোনারোর লিবারেল পার্টি নিম্নকক্ষ এবং সিনেটে বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য লুলাকে অন্যান্য দলের সমর্থন সংগ্রহ করতে হবে।

দেশের সরকারি ঋণ জিডিপির ৮২ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। সুদের হার উচ্চ এবং মূল্যবৃদ্ধিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক প্রকল্পগুলিতে ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থব্যবস্থা পরিচালনা করা লুলা সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।


.

Leave a comment