কলকাতার বিখ্যাত দুর্গাপুজোগুলির সঙ্গে টক্কর দিতে এবার থিমের চমকে নজর কাড়ছে মধ্যমগ্রাম। উত্তর ২৪ পরগনার এই শহরে মণ্ডপে মণ্ডপে দেখা যাচ্ছে দেশ-বিদেশের স্থাপত্য, পৌরাণিক আখ্যান এবং নানা সামাজিক বার্তার অনন্য সমন্বয়। কোথাও বিদেশি গির্জার আদলে তৈরি মণ্ডপের চূড়ায় ত্রিশূল, আবার কোথাও সন্ধ্যা নামলেই পরিবেশিত হচ্ছে মহাদেবের শিবতাণ্ডব। শিল্পকর্ম, ঝাড়বাতি, সাবেকি প্রতিমা এবং চোখধাঁধানো সাজসজ্জায় পুজোর দিনগুলিতে জমে উঠেছে মধ্যমগ্রামের উৎসবের আবহ।
রাশিয়ান চার্চের আদলে মণ্ডপ, মাথায় ত্রিশূল
মধ্যমগ্রামের উদয়রাজপুর মধ্যপাড়া সর্বজনীন দুর্গোৎসবের ৭৬তম বর্ষে বিশেষ আকর্ষণ ‘রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চ’ থিম। বিদেশি গির্জার স্থাপত্যের আদলে তৈরি মণ্ডপের চূড়ায় বসানো হয়েছে ত্রিশূল। এই ব্যতিক্রমী ভাবনা দর্শনার্থীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কও হয়েছে।উদ্যোক্তাদের ভাবনায় ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিদেশি স্থাপত্যশৈলীর মেলবন্ধন ঘটানোই ছিল মূল লক্ষ্য। মণ্ডপের বাইরের নকশার পাশাপাশি ভিতরের দুর্গাপ্রতিমা ও সাজসজ্জাও দর্শকদের আকর্ষণ করছে।
লালমাটির ঐতিহ্যে টেরাকোটার শিল্পকর্ম
উদয়রাজপুর দক্ষিণ পাড়ার ৭৪তম বর্ষের পুজোয় উঠে এসেছে ‘লাল মাটির সরানে’ থিম। বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার লালমাটির সংস্কৃতি এবং টেরাকোটা শিল্পের ঐতিহ্যকে মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।শিল্পকর্মের সূক্ষ্ম নকশার পাশাপাশি জীবন্ত প্রতিমার উপস্থাপনাও এই মণ্ডপের অন্যতম আকর্ষণ। বাংলার লোকশিল্প ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে দুর্গোৎসবের মেলবন্ধন দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় জমছে এখানে।
রাজস্থানি মার্বেল প্যালেসে রাজকীয় আবহ
উদয়রাজপুর হরিহরপুর সর্বজনীনের ৭৭তম বর্ষের পুজোতেও রয়েছে চোখধাঁধানো আয়োজন। রাজস্থানি মার্বেল প্যালেস ও শিশমহলের আদলে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। নান্দনিক কারুকার্য, ঝাড়বাতি এবং ফুলের বাগানের সাজ গোটা পরিবেশে এনেছে রাজকীয় ছোঁয়া।স্থাপত্যের সৌন্দর্য ও নিখুঁত সাজসজ্জার কারণে এই মণ্ডপও পুজো দর্শনের তালিকায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
কর্নাটক বিধানসভার আদলে নেতাজি সঙ্ঘ
মধ্যমগ্রামের বড় বাজেটের পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম নেতাজি সঙ্ঘ। তাদের ৪১তম বর্ষে মণ্ডপের থিম কর্নাটক বিধানসভা। বিশাল স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি এই মণ্ডপে দর্শনার্থীদের সুবিধার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে।রয়েছে বসার জায়গা, সেলফি জোন এবং আলাদা প্রবেশ ও প্রস্থান পথ। মণ্ডপের আধুনিক স্থাপত্যের সঙ্গে সাবেকি দুর্গাপ্রতিমার সংমিশ্রণ দর্শকদের আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
সন্ধ্যা নামলেই শিবতাণ্ডব, নারীশক্তির বার্তা
উদয়রাজপুর পেয়ারা বাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের ৫৮তম বর্ষে থিম ‘শিবতাণ্ডব’। বিশাল কালো পাথুরে পাহাড়ের আদলে তৈরি মণ্ডপের ভিতরে রয়েছে মহাদেব ও সাবেকি দুর্গাপ্রতিমা।এই মণ্ডপের বিশেষ আকর্ষণ সন্ধ্যার শিবতাণ্ডব উপস্থাপনা। মহাদেবের নৃত্যের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে এক নাটকীয় আবহ। একই সঙ্গে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং নারীশক্তির জাগরণের বার্তাও রয়েছে এই পুজোর ভাবনায়। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে পুলিশকর্মীদেরও তৎপর থাকতে হচ্ছে।
মহাভারতের কাহিনিতে দেবী দুর্গা, সেরা মণ্ডপের স্বীকৃতি
উদয়রাজপুর হেমন্ত বসু সরণি সর্বজনীনের পুজোও এবার বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। দশম বর্ষে তাদের থিম ‘মহাভারতের মহামায়া’। মহাভারতের যুদ্ধের আগে অর্জুনের দেবী আরাধনার কাহিনির পাশাপাশি দুর্গাপ্রতিমার পিছনে নটরাজ রূপে শিবের নৃত্য তুলে ধরা হয়েছে।পৌরাণিক আখ্যান ও শিল্পভাবনার এই সমন্বয়ের জন্য পুজোটি জেলা প্রশাসনের ‘দেবী দুর্গা সম্মান ২০২৬’-এ সেরা মণ্ডপের স্বীকৃতি পেয়েছে।
থিমের বৈচিত্র্যে পুজো দর্শনের নতুন ঠিকানা মধ্যমগ্রাম
বিদেশি গির্জা থেকে রাজস্থানি প্রাসাদ, বাংলার টেরাকোটা শিল্প থেকে পৌরাণিক কাহিনি—মধ্যমগ্রামের বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে রয়েছে নানা ধরনের চমক। শুধু বাহ্যিক সাজসজ্জা নয়, একাধিক মণ্ডপে সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।এই বৈচিত্র্যের কারণেই কলকাতার পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামও দুর্গাপুজো দর্শনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। মণ্ডপে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় সেই জনপ্রিয়তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দুর্গাপুজোর মণ্ডপসজ্জা ও থিমের অভিনবত্বে কলকাতার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম। কোথাও রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের আদলে তৈরি মণ্ডপের মাথায় ত্রিশূল, কোথাও আবার বিশাল পাথুরে পাহাড়ের মাঝে শিবতাণ্ডবের বিশেষ উপস্থাপনা। টেরাকোটা শিল্প, রাজস্থানি মার্বেল প্যালেস, কর্নাটক বিধানসভা এবং মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনিও জায়গা করে নিয়েছে বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে। অভিনব শিল্পভাবনা ও সামাজিক বার্তার মেলবন্ধনে মধ্যমগ্রামের পুজো এবার দর্শনার্থীদের বিশেষ নজর কাড়ছে।









