ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল সংস্থা মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে আমেরিকার নিউ মেক্সিকো আদালত। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং ব্যবহারকারীদের তথ্যের ব্যবহার সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা দেওয়ার অভিযোগে ২১ অক্টোবর ২০২৬ এই নির্দেশ দেওয়া হয়। মেটা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে।
ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং সেই তথ্যের উপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিউ মেক্সিকোতে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, সংস্থাটি ব্যবহারকারীদের আশ্বাস দিয়েছিল যে তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত এবং তাঁরা নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবেন, কারা সেই তথ্য দেখতে পারবেন। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে, সংস্থার দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী ব্যবহারকারীরা তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ পাননি।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি জুরি মেটাকে নিউ মেক্সিকোর উপভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের জন্য দায়ী সাব্যস্ত করে। এই মামলায় প্রায় ৪.৩৯ কোটি লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে আসে। এরপর বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ সংস্থাটিকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালত জানিয়েছে, জরিমানার বকেয়া অর্থের উপর বার্ষিক ১৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে।
ফেসবুকের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা সংক্রান্ত ঘটনা থেকে। ২০১৮ সালে প্রকাশ্যে আসে, ফেসবুক ব্যবহারকারী কয়েক কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য তাঁদের পূর্ণ সম্মতি ছাড়াই সংগ্রহ করা হয়েছিল।
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা ছিল ব্রিটেনের একটি রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা। অভিযোগ ছিল, ফেসবুক থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে সংস্থাটি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন দেখাত। এই বিতর্কে প্রায় ৮.৭ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য প্রভাবিত হয়েছিল।
ব্যবহারকারীদের পছন্দ, আগ্রহ এবং রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করে সেই অনুযায়ী তাঁদের বিজ্ঞাপন দেখানো হতো। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ফেসবুকের তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর ২০২১ সালে নিউ মেক্সিকো সরকার সংস্থাটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
![]()
নিউ মেক্সিকো সরকারের অভিযোগ ছিল, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বোঝাত যে তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য সম্পূর্ণভাবে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্য অ্যাপ এবং সংস্থাও ফেসবুকের সঙ্গে যুক্ত তথ্য পেতে পারত।
সরকারের দাবি, ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়, কার সঙ্গে তা ভাগ করে নেওয়া হয় এবং কোন কাজে ব্যবহার করা হতে পারে, সে সম্পর্কে সংস্থাটি স্পষ্ট তথ্য দেয়নি। আদালত এই অভিযোগগুলি বিবেচনা করে মেটার বিরুদ্ধে রায় দেয়।
২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানার নির্দেশের বিরোধিতা করেছে মেটা। সংস্থাটির প্রধান আইন আধিকারিক সি জে মাহোনি বলেছেন, এই ধরনের রায়ের ফলে নিউ মেক্সিকোতে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
মেটা জানিয়েছে, তারা আদালতের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করবে। সংস্থাটি উচ্চতর আদালতে আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আপিলের পর জরিমানার অর্থ চূড়ান্তভাবে কত দিতে হবে, সে বিষয়ে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে।
আদালতের রায়ের পর ব্যবহারকারীদের সরাসরি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের অর্থ দেওয়ার বিষয়ে কোনও ঘোষণা করা হয়নি।
মামলাটি নিউ মেক্সিকো সরকার দায়ের করেছিল। তাই আদালত জরিমানার অর্থ রাজ্যকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজের মতে, এই অর্থ শিক্ষা সংক্রান্ত সরকারি কাজে ব্যবহার করা হবে। ফলে বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা ঘোষণা করা হয়নি।
ব্যক্তিগত তথ্য সংক্রান্ত মামলায় এর আগেও আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়েছে ফেসবুকের মূল সংস্থা। ২০১৯ সালে আমেরিকার ফেডারেল ট্রেড কমিশন ফেসবুককে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল।
এ ছাড়া, ২০২২ সালে পৃথক একটি গোপনীয়তা সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করতে মেটা ৭২.৫ কোটি ডলারের সমঝোতা করেছিল। নিউ মেক্সিকো আদালতের সাম্প্রতিক রায় সংস্থাটির সামনে নতুন আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে এই মামলায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মেটা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার পর জরিমানা সংক্রান্ত চূড়ান্ত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।









