নিরাপত্তা মানেই আজ ডিজিটাল লক, স্মার্ট চাবি আর আধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু একসময় বাংলার মাটিতে তৈরি পিতলের তালাই ছিল রাজপ্রাসাদ থেকে ইউরোপের অভিজাত ভবনের অটুট ভরসা। উত্তর ২৪ পরগনার নাটাগড়—এককালের সেই গর্বিত তালাশিল্প কেন্দ্র—আজ নীরবে হারিয়ে যাওয়ার পথে।
নাটাগড়: বাংলার এক বিস্মৃত শিল্পনগরী
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পানিহাটি পৌরসভার অন্তর্গত নাটাগড়ের কামারপাড়া এলাকা গড়ে ওঠে তালা-চাবি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে। বংশানুক্রমে ধাতুশিল্পে দক্ষ কর্মকার পরিবারগুলির হাত ধরেই এই শিল্প পায় আন্তর্জাতিক পরিচিতি।
মোরগমার্কা তালা ও ইউরোপ জয়
নাটাগড়ের তৈরি পিতলের তালা—বিশেষ করে ‘মোরগমার্কা’ তালা—গঠনগত মজবুতির পাশাপাশি জটিল নকশার জন্য বিখ্যাত ছিল। ইতিহাস বলছে, আলিগড়ের তালার সঙ্গে সমানতালে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এই তালা, এমনকি জার্মানি-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হতো।
বনমালী কর্মকার: এক অনন্য প্রতিভা
এই শিল্পের উজ্জ্বলতম নাম বনমালী কর্মকার। তাঁর তৈরি এক বিশেষ মাস্টার কী দিয়ে একসঙ্গে প্রায় ১৪ ধরনের তালা খোলা যেত—যা তৎকালীন সময়ে ছিল অবিশ্বাস্য। ব্রিটিশ শাসকরাও তাঁর কারিগরি দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সম্মানিত করেন। তালার পাশাপাশি ঘড়ি তৈরিতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী।
কর্মকার বংশ ও শিল্পের বিস্তার
বনমালীর পরে পাঁচু গোপাল কর্মকার, ভূতনাথ কর্মকার-সহ একাধিক শিল্পী এই ঐতিহ্য বহন করেন। একসময় নাটাগড়ে প্রায় ২০-৩০টি কর্মকার পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ‘বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স’ ও ‘স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ বেঙ্গল’-এও এই শিল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়।
নবাবি দরবার থেকে ব্রিটিশ প্রশাসন
নবাবি আমলে রাজকোষ ও দরবারের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত হতো নাটাগড়ের তালা। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনকালে প্রশাসনিক দফতর ও অভিজাত বাড়িগুলিতেও এই তালা হয়ে ওঠে নিরাপত্তার প্রতীক। পানিহাটির বহু পুরনো বাড়িতে আজও সেই তালার নিদর্শন চোখে পড়ে।
বিলুপ্তির অন্ধকারে এক ঐতিহ্য
কিন্তু সময় বদলেছে। কারখানায় তৈরি সস্তা তালা, আধুনিক প্রযুক্তি আর নতুন প্রজন্মের আগ্রহের অভাবে নাটাগড়ের এই শিল্প আজ প্রায় অস্তিত্বহীন। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার কোনওভাবে ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
একসময় উত্তর ২৪ পরগনার সোদপুর সংলগ্ন নাটাগড় ছিল পিতলের তালা-চাবি শিল্পের বিশ্ববিখ্যাত কেন্দ্র। নবাবি কোষাগার থেকে শুরু করে ব্রিটিশ প্রশাসন—সবার ভরসা ছিল এই তালা। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি আর প্রজন্মগত অনীহায় আজ সেই শিল্প প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।













