মেলবোর্নে প্রধানমন্ত্রী মোদির আহ্বান, ভারত-অস্ট্রেলিয়া বিনিয়োগ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর ও বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব

কন্ডাক্টর, প্রযুক্তি, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্য সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। তিনি ECTA-পরবর্তী অগ্রগতি, CECA নিয়ে আলোচনা এবং দুই দেশের মধ্যে বহুমুখী অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত ভারত-অস্ট্রেলিয়া CEO ফোরাম এবং ইকোনমিক রোডম্যাপ বিজনেস রিসেপশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মতো নির্ভরযোগ্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর একসঙ্গে এগিয়ে চলা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব বর্তমানে অনিশ্চয়তা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং জ্বালানি সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের একটি নতুন মডেল হয়ে উঠতে পারে।

অনুষ্ঠান শেষে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি সেলফি তোলেন। এই ছবি দুই নেতার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় ভারতীয় সম্প্রদায়ও তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়।

মেলবোর্নের বিখ্যাত মার্ভেল স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রায় ৪০ হাজার ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এই অনুষ্ঠানকে ভারতীয় সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ভারত দ্রুত বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় বন্দর, বিমানবন্দর, রেলপথ, সড়ক, লজিস্টিকস, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সেমিকন্ডাক্টর এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ভারত সরকার বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ, স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলছে। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার বড় পেনশন তহবিলগুলো ভারতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতকে ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা অর্জন এবং ২০৭০ সালের মধ্যে নেট-জিরো নির্গমন অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

তিনি বলেন, ভারত গ্রিন হাইড্রোজেন, সৌর মডিউল, বায়ু টারবাইন এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি, মূলধন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ এই উদ্যোগকে আরও গতিশীল করতে পারে।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার বৃহৎ ইউরেনিয়াম মজুত ভারতের পারমাণবিক শক্তি পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

মেলবোর্নে প্রধানমন্ত্রী মোদির আহ্বান, ভারত-অস্ট্রেলিয়া বিনিয়োগ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর ও বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ভারত ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে দ্রুত বিনিয়োগ করছে। AI মিশন, কোয়ান্টাম মিশন এবং সেমিকন্ডাক্টর কর্মসূচির আওতায় সরকার ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা দিচ্ছে।

তিনি ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, চিপ উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশকে যৌথভাবে বৈশ্বিক সমাধান উন্নয়নের প্রস্তাব দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, রাজ্য, ছোট শহর, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পক্ষেত্রের মধ্যেও সরাসরি সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি প্রস্তাব দেন, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদকে ভারতের ওডিশা ও গুজরাটের উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। একইভাবে কুইন্সল্যান্ড ও তাসমানিয়ার কৃষি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিষয়ক দক্ষতা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

তিনি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। ডিকিন ইউনিভার্সিটি এবং উলংগং ইউনিভার্সিটির ভারতের GIFT সিটিতে ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠাকে তিনি এই আস্থার একটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য চুক্তি (ECTA) কার্যকর হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জানান, এখন দুই দেশ বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি (CECA)-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, দুই দেশের সরকার বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন শিল্পখাতের দায়িত্ব এই সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

প্রধানমন্ত্রী মোদির অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় প্রতিরক্ষা খাতেও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

ভারত ও অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়িয়ে চলেছে। এই সফরের মাধ্যমে সেই সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে।

 

Leave a comment