ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং পোল্যান্ডের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-সংক্রান্ত একটি সামরিক ইউনিটের নামকরণকে কেন্দ্র করে নতুন কূটনৈতিক বিরোধ দেখা দিয়েছে। ইউক্রেন একটি সামরিক ইউনিটের নাম বিতর্কিত “ইউক্রেনিয়ান ইনসার্জেন্ট আর্মি (UPA)”–এর নামে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি জেলেনস্কি একটি ডিক্রি জারি করে ইউক্রেনের স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেসের একটি সামরিক ইউনিটের নাম UPA–এর নামে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তের পর পোল্যান্ডে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
UPA ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে সক্রিয় ছিল। ইউক্রেনে সংগঠনটিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, যারা সোভিয়েত রেড আর্মি এবং নাৎসি জার্মানি উভয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। তবে পোল্যান্ডের দাবি, ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ভলহিনিয়া অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ জাতিগত পোলিশ নাগরিক হত্যার জন্য সংগঠনটির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোকি জেলেনস্কির কাছ থেকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান “অর্ডার অব দ্য হোয়াইট ঈগল” প্রত্যাহার করা হবে কি না, তা বিবেচনা করছেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনি এ বিষয়ে অর্ডার কাউন্সিলের পরামর্শ চেয়েছেন এবং শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
![]()
নাভরোকি জেলেনস্কির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এটিকে “অপরাধী ও হত্যাকারীদের মহিমান্বিত করা” বলে অভিহিত করেছেন।
UPA-কে ইউক্রেনে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে দেখা হলেও পোল্যান্ডে সংগঠনটিকে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই ভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাই বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
পোল্যান্ডের ডানপন্থী থেকে বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। কয়েকজন আইনপ্রণেতা বলেছেন, ইউক্রেন এমন ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো উপেক্ষা করেছে, যেখানে পোলিশ নাগরিকদের হত্যা করা হয়েছিল।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে পোল্যান্ড ইউক্রেনকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছে। দেশটি লক্ষাধিক ইউক্রেনীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সামরিক সহায়তাও অব্যাহত রেখেছে।
তবে নতুন এই বিরোধের পর পোল্যান্ডে এমন মত বাড়ছে যে ইউক্রেন তার দীর্ঘদিনের সহযোগীদের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীলতা দেখাচ্ছে না। কিছু বিরোধী আইনপ্রণেতা ইউক্রেনকে দেওয়া অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, যেমন স্টারলিংক সেবা, পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
পোল্যান্ডের কয়েকজন ডানপন্থী নেতা ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) সদস্যপদ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, ইউক্রেন তার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলোর পুনর্মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত ইউরোপীয় পরিবারের অংশ হওয়ার প্রস্তুতি সম্পর্কে আস্থা রাখা কঠিন।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী Donald Tusk উভয় দেশকে “সরাসরি ও সৎ সংলাপ”-এ অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সহযোগিতা দুই দেশের স্বার্থে, আর সংঘাত থেকে লাভবান হবে শুধু রাশিয়া।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের প্রধান কিরিলো বুদানোভ সম্প্রতি ওয়ারশ সফর করেন।
তবে এই উদ্যোগ সফল হয়নি। এরপর পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সম্মাননা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ নেন।
ইউক্রেন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কঠোর সরকারি প্রতিক্রিয়া জানায়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের উদ্দেশ্য কোনো দেশকে আঘাত করা ছিল না।
জেলেনস্কির সহযোগীরা বলেছেন, সিদ্ধান্তটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
পোল্যান্ড যদি জেলেনস্কির সম্মাননা প্রত্যাহার করে, তাহলে তা ইউক্রেনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর ফলে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া, ইউরোপে ইউক্রেন-সমর্থন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক আলোচনাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে, যেখানে ইতোমধ্যে কিছু গোষ্ঠী ইউক্রেনের বিভিন্ন নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পোল্যান্ডে ইউক্রেন পুনর্গঠন-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রস্তুতির মধ্যে এই ইস্যু আগামী দিনে আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
বিরোধ আরও গভীর হলে ইউক্রেন ও পোল্যান্ডের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।








